ইসলামে পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে কেবল অভ্যাসের অংশ করা হয়নি, বরং একে সরাসরি ইবাদতের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে পরিচ্ছন্ন আত্মাকে যেমন মহান আল্লাহ ভালোবাসার ঘোষণা দিয়েছেন, তেমনি হাদিস শরিফেও একে ‘ঈমানের অর্ধেক’ বলা হয়েছে। মানুষের হাত ও পায়ের নখ ছোট রাখা ইসলামের ‘ফিতরাত’ বা মানুষের সহজাত স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত একটি অন্যতম সুন্নাহ। প্রতিদিনের অতি সাধারণ এই কাজটিও যদি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও ইসলামিক আদব মেনে করা হয়, তবে তা আমলনামায় অনেক সওয়াব যুক্ত করে।
কেন নখ কাটার ক্ষেত্রে ইসলামিক নিয়ম মানবেন?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, নখ তো কাটার মতোই কাটলে হয়, এখানে নিয়ম মানার কী প্রয়োজন? মূলত তিনটি বড় কারণে একজন মুমিনের ইসলামিক পদ্ধতি মেনে চলা উচিত…
দৈনন্দিন কাজকে ইবাদতে রূপান্তর: একজন সাধারণ মানুষ শুধু শরীর পরিষ্কারের জন্য নখ কাটে। কিন্তু একজন মুমিন যখন সুন্নাহর নিয়তে ডান দিক থেকে শুরু করে নখ কাটে, তখন তার সাধারণ অভ্যাসটি ‘ইবাদত’ ও ‘সওয়াব’-এর উসিলা হয়ে যায়।
মানসিক ও আত্মিক শৃঙ্খলা: ইসলাম জীবনের প্রতিটি ছোট ছোট বিষয়ে অনুশাসন ও সুন্দর নিয়ম শিখিয়েছে। নখ কাটার এই বিশেষ ক্রম অনুসরণ করলে মানুষের মন ও আচরণে এক ধরনের ধর্মীয় শৃঙ্খলা ও সচেতনতা তৈরি হয়।
নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা: হাত এবং পা মহান আল্লাহর দেওয়া কত বড় নিয়ামত, তা আমরা প্রতিদিন এর ব্যবহারের মাধ্যমে বুঝতে পারি। সেই অঙ্গগুলোর পরিচ্ছন্নতা আল্লাহর দেখানো পথে করার মাধ্যমে মূলত নিয়ামতের এক প্রকার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়।
নখ কাটার সেরা সময় কোনটি?
ইসলামি স্কলারদের মতে, সপ্তাহে অন্তত একবার হাত ও পায়ের নখ কাটা সুন্নত। মুসলমানদের জন্য সপ্তাহের সবচেয়ে সেরা ও বরকতময় দিন হলো শুক্রবার (জুমা)। তাই জুমার নামাজের প্রস্তুতি হিসেবে গোসল করা ও সুগন্ধি মাখার পাশাপাশি নখ কাটাও একটি চমৎকার আমল।
তবে নখ যদি বেশি বড় হয়ে যায়, তবে শুক্রবারের জন্য বসে না থেকে দ্রুত কেটে ফেলা উচিত। মনে রাখা জরুরি, কোনো অবস্থাতেই যেন নখ কাটা ছাড়া ৪০ দিনের বেশি সময় পার না হয়। কারণ হাদিসে এর বেশি সময় নখ বা অপ্রয়োজনীয় পশম না কেটে রাখাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
হাতের নখ কাটার প্রচলিত ইসলামিক আদব
যেকোনো ভালো কাজ ডান দিক থেকে শুরু করা ইসলামের অন্যতম সুন্দর একটি আদব। ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থগুলোতে বুজুর্গদের অনুসৃত হাতের নখ কাটার একটি সুন্দর ধারাবাহিকতা উল্লেখ করা হয়েছে:
ধাপ ১: প্রথমে ডান হাতের শাহাদাত (তর্জনী) আঙুল থেকে নখ কাটা শুরু করে ক্রমান্বয়ে মধ্যমা, অনামিকা ও কনিষ্ঠা (কড়ে) আঙুলের নখ কাটতে হবে। অর্থাৎ, প্রথম দফায় ডান হাতের বুড়ো আঙুল বাদ থাকবে।
ধাপ ২: এরপর বাম হাতের কনিষ্ঠা (কড়ে) আঙুল থেকে নখ কাটা শুরু করে সিরিয়ালি বুড়ো আঙুল পর্যন্ত সবগুলো নখ কেটে শেষ করতে হবে।
ধাপ ৩: সবশেষে ডান হাতের বাদ পড়ে যাওয়া বুড়ো আঙুলের নখটি কাটার মাধ্যমে হাতের প্রক্রিয়া শেষ হবে।
পায়ের নখ কাটার ধারাবাহিকতা
পায়ের নখ কাটার ক্ষেত্রেও ডান দিককে প্রাধান্য দেওয়া মোস্তাহাব। এর নিয়মটি তুলনামূলক সহজ ও সোজা…
ডান পা: ডান পায়ের কনিষ্ঠা (সবচেয়ে ছোট) আঙুল থেকে নখ কাটা শুরু করে ক্রমান্বয়ে বুড়ো আঙুল পর্যন্ত এসে শেষ করতে হবে।
বাম পা: এরপর বাম পায়ের বুড়ো আঙুল থেকে শুরু করে একে একে কনিষ্ঠা (সবচেয়ে ছোট) আঙুল পর্যন্ত গিয়ে নখ কাটা শেষ করতে হবে।
জরুরি সতর্কতা ও মূল বিষয়
ইসলামি আইনবিদদের মতে, আঙুলের এই নির্দিষ্ট সিরিয়াল বা ক্রমটি হুবহু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সরাসরি কোনো সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এটি মূলত ইসলামের ফকিহ ও বুজুর্গদের দীর্ঘদিনের চর্চা এবং একটি পছন্দনীয় আদব বা মোস্তাহাব আমল।
তাই এই নির্দিষ্ট সিরিয়াল বজায় রাখাকে ‘ফরজ’ বা ‘আবশ্যিক সুন্নত’ মনে করে অন্য কাউকে জোর করা বা ভুল ধরার সুযোগ নেই। নখ কাটার মূল সুন্নাহ হলো তিনটি…
১. নিয়মিত নখ ছোট ও পরিষ্কার রাখা।
২. ৪০ দিনের বেশি নখ বড় না করা।
৩. কাটার সময় ডান দিক থেকে শুরু করা।
শেষ কথা
আমাদের জীবনের প্রতি মুহূর্তকে আমরা চাইলে সওয়াবের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে পারি। নখ কাটার মতো অতি সাধারণ একটি বিষয়কে অবহেলা না করে, যদি আমরা পবিত্রতার নিয়তে এবং ডান দিককে প্রাধান্য দিয়ে এই আদবগুলো চর্চা করি, তবে তা যেমন আমাদের সুস্থ রাখবে, তেমনই পরকালের জন্য বড় সঞ্চয় হবে।