মাথার ওপর সূর্যটা যেন আগুন ঢালছে। সেই সাথে গায়ে জমছে একফোঁটা স্বস্তির খোঁজ। ঠিক এই চরম মুহূর্তেই যদি দূর থেকে ভেসে আসে এক তীব্র আনন্দের চিৎকার, উঁচু স্লাইডের উপর থেকে এক ঝটকায় বিশাল সুইমিং পুলের হাঁটু পানিতে ধপাস করে আছড়ে পড়ার আওয়াজ আর চারিদিকে ছিটকে ওঠা কনকনে ঠান্ডা পানির ফোঁটা! তবে কেমন হয়? হ্যাঁ, ঠিক এই গা ছমছমে রোমাঞ্চ আর হুশ করে পানিতে ভেসে যাওয়ার অপার আনন্দ উদযাপন করতেই বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ন্যাশনাল ওয়াটারপার্ক ডে। প্রতি বছর ২৮ জুলাই দিনটি আসলে কাঠফাটা গরমকে এক চুটকিতে বিদায় জানিয়ে সুইমিং কস্টিউম পরে পানির রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় বাহানা। ঘরের চার দেয়ালের দমবন্ধ ভাব আর শহুরে ব্যস্ততাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেন লাখ লাখ মানুষ এই দিনে ওয়াটারপার্কের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ায়, তার পেছনের গল্পটাও বেশ জম্পেশ।
উত্তাপ কাটানোর এক রাজকীয় বাহানা
প্রতি বছর জুলাই মাসের একদম শেষ ভাগে যখন গ্রীষ্মের উত্তাপ চরমে ওঠে, ঠিক তখনই মানুষ খোঁজে একটু ঠান্ডা ছায়া আর পানির স্পর্শ। তবে এই দিনটি কিন্তু হুট করে কোনো অলৌকিক নিয়ম মেনে বাতাসে ভেসে আসেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ক্যালাহারি রিসোর্টস অ্যান্ড কনভেনশনস ২০১৭ সালের ২৮ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিবসের সূচনা করে। উদ্দেশ্যটা ছিল খুব সাধারণ; কিন্তু ভীষণ মজার। বছরের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়ে পরিবার আর বন্ধুদের সাথে নিয়ে ডিজিটাল পর্দা বা মুঠোফোনের দুনিয়া ছেড়ে সরাসরি পানিতে লাফিয়ে পড়া এবং সবাই মিলে স্মৃতির অ্যালবাম ভারী করা। শুরুর পর থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি, দ্রুতই এটি একটি আন্তর্জাতিক অনানুষ্ঠানিক উৎসবে রূপ নেয় এবং আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ওয়াটারপার্কপ্রেমিরা অত্যন্ত উদ্দীপনার সঙ্গে এই বিশেষ দিনটি উদযাপন করেন।
পাইপ বেয়ে সোজা পানিতে আছড়ে পড়া
পানি আর উঁচুতে ওঠার খেলার ইতিহাসটা কিন্তু বেশ পুরনো ও চটুল। ইতিহাসে নজর দিলে দেখা যায়, ১৯০৬ সালে নিউজিল্যান্ডের এক প্রদর্শনীতে প্রথম আধুনিক ওয়াটার স্লাইডের আদি রূপ দেখা গিয়েছিল, যা মানুষকে খুব দ্রুত আকর্ষিত করে। এরপর ১৯৭৭ সালে জর্জ মিলেই নামের এক আমেরিকান উদ্যোক্তা ফ্লোরিডায় ‘ওয়েট এন ওয়াইল্ড’ নামে একটি কৃত্রিম পানির পার্ক তৈরি করে বিনোদনের জগতে রীতিমতো ঝড় তুলে দেন, যার জন্য তাকে ওয়াটারপার্কের জনকও বলা হয়। উঁচুতে প্যাঁচানো নল বেয়ে বাতাসের বেগে নিচে নেমে আসা, কৃত্রিম ঢেউয়ের সঙ্গে শরীর ভাসিয়ে দেওয়া আর আলসে নদীতে শান্ত হয়ে ভেসে থাকার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চ মানবজাতিকে এতই মাতাল করেছিল যে এক দশকের মধ্যেই এই পার্কগুলো বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যায়।
পানির রাজত্বের অভাবনীয় কিছু সত্য
পানির এই বিনোদন কেন্দ্রগুলোকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে রয়েছে অজস্র অবাক করা এবং বিস্ময়কর তথ্য। আমেরিকার উইসকনসিন ডেলস অঞ্চলকে বলা হয় গোটা বিশ্বের ‘ওয়াটারপার্কের রাজধানী’, কারণ সেখানে মানুষের অনুপাতের তুলনায় সবচেয়ে বেশি কৃত্রিম পানির পার্ক রয়েছে। অন্যদিকে কানাডার এডমন্টনে তৈরি হয়েছিল বিশ্বের প্রথম বিশাল ইনডোর বা ছাদ ঢাকা পানির পার্ক, যা যেকোনো মৌসুমেই মানুষকে আনন্দ দেয়। রোমাঞ্চ প্রিয়দের জন্য বিশালাকার স্লাইড যেমন রয়েছে, তেমনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঢেউয়ের তালে ভেসে থাকার সুব্যবস্থাও পার্কগুলোতে মেলে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে সানস্ক্রিন মেখে পানিতে ডুব দেওয়ার এই আদিম আনন্দই পুরো বিশ্বের বিনোদন শিল্পে এক নতুন ধারা তৈরি করেছে।
পানির শেষ ছিটেফোঁটায় নতুন সকালের ডাক
হঠাৎ একটা বিশালাকার প্লাস্টিকের বালতি থেকে শত শত গ্যালন পানি এসে মাথায় পড়তেই চারপাশের সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে এক নিমেষে সাফ হয়ে যায়। জলের সেই ছিটকে ওঠা ফোঁটাগুলো যখন রোদের আলোয় ঠিকরে পড়ে, তখন মনে হয় জীবনটা আসলে এই ছোট্ট উদযাপনের নামই। তাই জীবনের সব জটিলতা, কাজ আর ব্যস্ততাকে কোনো এক উঁচুর স্লাইড থেকে পানিতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আজ একটু প্রাণ খুলে হাসার দিন, কারণ এই রূপালী পানির তোড় আর কখনো ফিরে আসবে না।