মানুষের জীবনে নেমে আসা নানা বিপদ-আপদ ও অশান্তির অন্যতম প্রধান কারণ হলো জেনে-না-জেনে বিভিন্ন পাপে জড়িয়ে পড়া। গুনাহ মানুষের স্বভাবজাত বিষয় হলেও সব পাপের পরিণাম এক নয়। কিছু সাধারণ ভুলত্রুটি ছাড়াও এমন কিছু জঘন্য অপরাধ রয়েছে, যেগুলো একজন মানুষের ঈমান ধ্বংস করার পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও জাতীয় জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে এসব অপরাধকে ‘কবিরা গুনাহ’ বা মহাপাপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবন ধ্বংসকারী এমন সাতটি মারাত্মক অপরাধের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলোর জন্য তিনি ‘আল-মুবিকাত’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। ‘আল-মুবিকাত’ মানে এমন ধ্বংসাত্মক পাপ, যা মানুষকে দুনিয়াতে চরম বিপদে ফেলে এবং আখিরাতে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি করে।
বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপ থেকে বেঁচে থাকো।’ সাহাবিরা জানতে চাইলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! সে অপরাধগুলো কী?’ তখন নবীজি (সা.) যে সাতটি কারণ চিহ্নিত করেন, তা হলো…
আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা
কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা বা তাঁর ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক করাই হলো শিরক। কোরআনের দৃষ্টিতে এটি সবচেয়ে বড় অপরাধ। আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে, তওবা না করে মারা গেলে তিনি শিরকের অপরাধ ক্ষমা করবেন না (সুরা নিসা: ৪৮)।
জাদু ও কুফুরি করা
জাদুটোনা কেবল মানুষের ক্ষতিই করে না, বরং এটি ঈমান ধ্বংসের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হারুত-মারুতের ঘটনা থেকে জানা যায়, জাদুর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মতো পবিত্র বাঁধনেও ভাঙন ধরানো হতো (সুরা বাকারা: ১০২)। বর্তমান সমাজেও কুফুরি কালাম, তাবিজ-কবজ ও জাদুটোনার মাধ্যমে বহু মানুষের জীবনের স্বাভাবিক শান্তি বিনষ্ট হচ্ছে।
অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা
মানবজীবনের নিরাপত্তাকে ইসলাম সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী, কোনো নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা পুরো মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল (সুরা মায়িদা: ৩২)। যেকোনো ধরনের সন্ত্রাস, পরিকল্পিত নির্যাতন বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অন্যায্যভাবে কারও জীবন কেড়ে নেওয়া জীবনের ওপর বড় বিপদ ডেকে আনে।
সুদের লেনদেন
অর্থনৈতিক শোষণের মূল হাতিয়ার সুদ ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে বরকত ও শান্তি ধ্বংস করে দেয়। মহান আল্লাহ সুদের ব্যাপারে এতই কঠোর যে, সুদখোরদের বিরুদ্ধে আল্লাহ ও তার রাসুলের পক্ষ থেকে সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে (সুরা বাকারা: ২৭৯)।
এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা
অসহায় ও অভিভাবকহীন এতিমের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে দখল করা অত্যন্ত জঘন্য পাপ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, যারা অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদ খায়, তারা মূলত নিজেদের পেটে আগুন ভরে এবং অচিরেই তারা জ্বলন্ত জাহান্নামে প্রবেশ করবে (সুরা নিসা: ১০)।
রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা
সত্য ও ন্যায়ের লড়াইয়ে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে ভয় পেয়ে পিছু হঠা মুসলিম সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। তবে যুদ্ধকৌশলের অংশ হিসেবে বা নিজেদের পুনর্বিন্যস্ত করার উদ্দেশ্যে অবস্থান পরিবর্তন করা এর অন্তর্ভুক্ত নয় (সুরা আনফাল: ১৫-১৬)।
সতী নারীদের ওপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়া
মানুষের সম্মানহানি করা, বিশেষ করে কোনো চরিত্রবান ও নিরপরাধ নারীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ আনা ভয়াবহ অপরাধ। কোরআনে বলা হয়েছে, যারা সতী ও ঈমানদার নারীদের ওপর অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত (সুরা নূর: ২৩)।
ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষকদের মতে, এই সাতটি অপরাধের কিছু মানুষের স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে, কিছু মানুষের অধিকার হরণ করে, আর কিছু সামাজিক শান্তি ও নৈতিকতাকে ধুলিসাৎ করে দেয়। আর এসব কারণেই মানুষের জীবন থেকে বরকত ও শান্তি হারিয়ে গিয়ে নেমে আসে কঠিন সংকট। তাই দুনিয়ার বিপদ থেকে বাঁচতে এবং আখিরাতের মুক্তি নিশ্চিত করতে এসব মহাবিপদ ডেকে আনা পাপ থেকে নিজে বেঁচে থাকা এবং অন্যকে সচেতন করা প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানি দায়িত্ব।