১৯৪০-এর দশকের এক কুয়াশাচ্ছন্ন বিকেলে লন্ডনের শহরতলির এক বাগানে বসে বসে এক নারী একটানা খটখট শব্দে ম্যানুয়াল টাইপরাইটারে আঙুল চালিয়ে যাচ্ছেন। চোখের সামনে খেলা করছে এক রহস্যময় দ্বীপ, গোপন সুড়ঙ্গ, আর অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় মেতে ওঠা চার শিশু ও তাদের এক বিশ্বস্ত কুকুর। টাইপরাইটারের খটখট শব্দ যেন কেবল অক্ষরের ছাপ ফেলছিল না, বরং তৈরি করছিল এমন এক জাদুকরী জগত যা পৃথিবীর কোটি কোটি শিশুর কল্পনার দুয়ার খুলে দিতে যাচ্ছিল। কোনো দীর্ঘ পরিকল্পনা নয়, মানচিত্র সাজানো নয়, কেবল চোখের সামনে ভেসে ওঠা কল্পনার দৃশ্যগুলোকে মিনিটে ৯০টি শব্দের অবিশ্বাস্য গতিতে পাতায় রূপ দিচ্ছিলেন সেই নারী। সেই নিভৃতচারী জাদুকরই হলেন ব্রিটিশ শিশুসাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাজ্ঞী ইনিড ব্লাইটন।
১৮৯৭ সালের ১১ আগস্ট লন্ডনের ডালস্টনে জন্ম নেন ইনিড মেরি ব্লাইটন। বাবা থমাস কেয়ারি ব্লাইটন ছিলেন একজন কাটলারি ব্যবসায়ী, যার কাছ থেকেই ইনিড পেয়েছিলেন প্রকৃতি, সংগীত ও সাহিত্যের প্রতি গভীর ভালোবাসা। তবে শৈশবেই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ তার মনোজগতে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে। বাস্তব জীবনের জটিলতা ও যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ইনিড আশ্রয় নেন বই আর নিজের বানোনো কল্পনার জগতে। শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ নিয়ে পেশাগত জীবন শুরু করলেও খুব দ্রুতই অনুধাবন করেন যে, শিশুদের মনের ভাষা তিনি খুব সহজেই পড়তে পারেন এবং তাদের জন্য গল্প লেখাই তার জীবনের আসল উদ্দেশ্য।
১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কবিতার বই ‘চাইল্ড হুইস্পারস’। কিন্তু তা ছিল কেবল এক বিশাল ঝড়ের পূর্বাভাস। পরবর্তী কয়েক দশকে তার লেখনী থেকে জন্ম নেয় একের পর এক কালজয়ী সিরিজ। ‘ফেমাস ফাইভ’ (Famous Five)-এর জুলিয়ান, ডিক, জর্জ, অ্যান আর কুকুর টিমির দ্বীপে দ্বীপে অ্যাডভেঞ্চার; ‘সিক্রেট সেভেন’ (Secret Seven)-এর গোপন সভার সংকেত আর গোয়েন্দাগিরি; কিংবা কাঠের পুতুল ‘নডি’ (Noddy)-র খেলনাহাটের হাসিখুশি গল্প সবই বিশ্বজুড়ে শিশুদের পড়ার অভ্যাসে এক নতুন বিপ্লব এনে দেয়। ‘ফারঅ্যাওয়ে ট্রি’ কিংবা ‘দ্য নটিগেস্ট গার্ল’ থেকে শুরু করে ‘ম্যালোরি টাওয়ার্স’-এর মতো বোর্ডিং স্কুলের গল্পগুলো কয়েক প্রজন্ম ধরে শিশুদের শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
ইনিড ব্লাইটনের লেখার মূল শক্তি ছিল এর সহজ পাঠযোগ্যতা এবং অসাধারণ গতিময়তা। তিনি জটিল কোনো দর্শন শেখাতে যাননি; বরং প্রকৃতির রূপ, বন্ধুদের মেলবন্ধন, পিকনিকের খাবার, অ্যাডভেঞ্চারের শিহরন আর অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শিশুদের জয়ের আনন্দকে খুব সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন। সমালোচকরা কখনো কখনো তার সাহিত্যিক মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এমনকি লাইব্রেরি থেকেও তার বই সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু পাঠকদের তীব্র ভালোবাসার সামনে সেসব বাধা টিকে থাকেনি। বিশ্বজুড়ে তার লেখা সাড়ে সাতশটিরও বেশি বই বিক্রি হয়েছে ৬০ কোটিরও বেশি কপি, যা অনুদিত হয়েছে প্রায় ৯০টিরও বেশি ভাষায়।
১৯৬৮ সালের২৮ নভেম্বর জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কালজয়ী লেখিকা। জীবনের শেষভাগে আলঝেইমার্সে আক্রান্ত হলেও তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো আজও একবিন্দু ম্লান হয়নি। কোনো জাদুদণ্ড ছাড়াই কেবল একটি টাইপরাইটার হাতে নিয়ে যে নারী বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিশুর শৈশবকে রঙিন ও অ্যাডভেঞ্চারময় করে তুলেছিলেন, সেই ইনিড ব্লাইটন আজও প্রতিটি শিশুর প্রথম বইয়ের পাতায়, গোপন সুড়ঙ্গের অ্যাডভেঞ্চারে এবং রূপকথার ফারঅ্যাওয়ে ট্রির মাথায় অমর হয়ে বেঁচে আছেন।