কল্পনা করুন তো, ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা সাধারণ এক ড্রয়ার পরিষ্কার করতে গিয়ে আপনি এমন কিছু ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন, যার মূল্য কয়েক বছর পর দাঁড়াল সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকারও বেশি! শুনে কোনো অবিশ্বাস্য কল্পকাহিনি মনে হলেও ব্রিটিশ আইটি প্রকৌশলী জেমস হাওয়েলসের জীবনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বড় ভুলের দলিল। ২০০৯ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সির দুনিয়া যখন সদ্য জন্ম নিচ্ছে, ঠিক তখনই নিজের সাধারণ ল্যাপটপ দিয়ে প্রায় ৮,০০০ বিটকয়েন তৈরি বা মাইন করেছিলেন এই তরুণ। তখনকার দিনে এই ডিজিটাল মুদ্রার বাজারমূল্য এক কাপ চায়ের দামের চেয়েও কম ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই বিটকয়েন অ্যাকাউন্টের পরম কাঙ্ক্ষিত ডিজিটাল চাবি বা প্রাইভেট কি সংরক্ষিত থাকা ছোট্ট হার্ডড্রাইভটি হারিয়ে যায় ২০১৩ সালে। ঘরের জঞ্জাল পরিষ্কারের এক বদখেয়ালে ড্রাইভটি চলে যায় এক কুচকুচে কালো বর্জ্যের ব্যাগে, আর সেটি সোজা গিয়ে পড়ে স্থানীয় নিউপোর্ট শহরের ডকসওয়ে ময়লার ভাগাড়ে। মুহূর্তের একটি অসাবধানতা যে হাওয়েলসের পুরো ভাগ্যকে চিরতরে আবর্জনার স্তূপে বন্দি করে দেবে, তা হয়তো তিনি নিজেও তখন ভাবতে পারেননি।
রোবট নিয়ে ময়লার সাগরে অভিযান
বিটকয়েনের আন্তর্জাতিক বাজার যখন হু হু করে বাড়তে শুরু করল, তখন ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া ওই প্লাস্টিকের টুকরোটির দামও পৌঁছাল আকাশচুম্বী উচ্চতায়। হারিয়ে যাওয়া ড্রাইভ উদ্ধারে এরপর যা শুরু হলো, তাকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি বর্জ্য খোঁজার মহাকাব্যিক অভিযান বললেও ভুল হবে না। জেমস হাওয়েলস শুধু চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি, বরং বর্জ্য সরাতে ও অনুসন্ধান চালাতে তিনি গড়ে তোলেন আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিবিদ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্স বিশেষজ্ঞদের এক সুসংগঠিত দল। ময়লার স্তূপের নিচে ড্রাইভের সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয় বিশেষ স্ক্যানার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ক্যামেরা, যা চোখের পলকে আবর্জনা বাছাই করতে পারে। হাজার হাজার টন ময়লা সরানো এবং ডগ ট্র্যাকিং রোবটের পেছনে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টন আবর্জনার নিচে চাপা পড়া সেই ড্রাইভ খুঁজে পাওয়ার আশায় বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়েছেন এই ব্রিটিশ নাগরিক, কিন্তু ভাগাড়ের বন্ধ দরজা তার সামনে খোলেনি।
কোটি টাকার প্রস্তাব এবং সিটি কাউন্সিলের বাধা
যেখানে কোটি কোটি টাকার ডিজিটাল সম্পদ আটকে আছে, সেখানে কেন খননকাজ চালানো গেল না এই প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগতে পারে। আসলে হাওয়েলস স্থানীয় নিউপোর্ট সিটি কাউন্সিলকে উদ্ধারকৃত সম্পদের এক-চতুর্থাংশ বা বিশাল অঙ্কের অর্থ শহরের সামাজিক উন্নয়নের জন্য দান করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে সিটি কাউন্সিল পরিবেশগত বিপর্যয় ও আইনি নিয়মনীতির দোহাই দিয়ে শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানে অনড় থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অত পুরোনো আবর্জনা খুঁড়ে বের করতে গেলে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়ে স্থানীয় পরিবেশ ও আশপাশের জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারত। আইনি বাধা, জমি ব্যবহারের স্বত্বাধিকার এবং পরিবেশ রক্ষার নামে সরকারি কঠোর নিষেধাজ্ঞার ফলে হাওয়েলসের শত চেষ্টা বারবার ব্যর্থতার মুখে পড়ে। হাজার কোটি টাকার ধনভাণ্ডারের অবস্থান চোখ দিয়ে দেখার সুযোগ থাকলেও, তা ছুঁয়ে দেখার কোনো পথ খোলা রাখেনি সিটি কাউন্সিল।
ব্রিটেনের হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া দরজা
একক প্রচেষ্টায় কোনো কাজ না হওয়ায় শেষমেশ আদালতের দরজায় টোকা দেন জেমস হাওয়েলস। বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে ময়লার ভাগাড়ে প্রবেশাধিকার ও খননকাজের অনুমতি পেতে দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যান তিনি। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটেনের হাইকোর্ট হাওয়েলসের সব আইনি আবেদন চূড়ান্তভাবে বাতিল করে দেয়। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং স্থানীয় প্রশাসনের ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে এমন কোনো বিপজ্জনক খননকাজের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। এই রায়ের মধ্য দিয়ে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার ধনভাণ্ডার ফিরে পাওয়ার সবকটি আশার সলতে নিভে যায়। হাজার কোটি টাকার ডিজিটাল সম্পদ আজ চোখের সামনে ডাস্টবিনে জমে থাকা প্লাস্টিক ও ধুলোবালির নিচে বন্দি হয়ে আছে, আর দূর থেকে অসহায়ের মতো সেই আবর্জনার স্তূপের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আজ আর কিছুই করার নেই দুর্ভাগ্যবান সেই ব্রিটিশ প্রকৌশলীর।