ঢাকা: অনলাইনে হেরোইন তৈরির কাঁচামালের অবাধ বিক্রির ঘটনায় ই-কেমের আইটি ম্যানেজার মো. আব্দুল মোমিন পাটোয়ারীকে গ্রেফতার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। এ সময় অভিযানে ই-কেমের হেফাজত থেকে ৬ লিটার নিয়ন্ত্রিত প্রিকারসর কেমিক্যাল এবং অননুমোদিত কেনাবেচার নথিপত্র জব্দ করা হয়।
বুধবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপপরিচালক মেহেদী হাসান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সাইবার পেট্রোলিং থেকে গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, ই-কেম নামীয় একটি প্রতিষ্ঠান তাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ বিক্রির বিজ্ঞাপন দিচ্ছে এবং অর্ডার গ্রহণ করছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। তথ্যটি আরও যাচাই করতে গিয়ে এবং পূর্ববর্তী একটি মামলার তদন্তের সূত্র ধরে দেখা যায়, খোলাবাজার থেকে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল সংগ্রহ করে অবৈধ মাদক তৈরির প্রস্তুতি নেওয়ার সম্ভাব্য কার্যক্রমের সঙ্গে এসব নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। গোয়েন্দা তথ্য যাচাইয়ের অংশ হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে ই-কেমের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ৫০০ মিলিলিটার এসিটিক এ্যানহাইড্রাইড অর্ডার করা হয়, যা মরফিন থেকে হেরোইন উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।
উপ-পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, অর্ডার গ্রহণের ক্ষেত্রে ক্রেতার কাছ থেকে কেমিক্যাল ক্রয়ের প্রয়োজনীয় অনুমোদন, লাইসেন্স বা ব্যবহারের উদ্দেশ্য সংক্রান্ত কোনো নথি চাওয়া হয়নি। অর্ডার গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পণ্য সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে পণ্যটি ঢাকার নিকেতন এলাকায় পৌঁছালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের গোয়েন্দা দল সেখানে অভিযান পরিচালনা করে। গত ২৪ আগস্ট গুলশান থানাধীন নিকেতন এলাকায় ই-কেমের সরবরাহকৃত পার্সেল থেকে ৫০০ মিলিলিটার এসিটিক এ্যানহাইড্রাইড এবং ১ লিটার এসিটোন জব্দ করা হয়।
তিনি জানান, ডেলিভারিম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, ই-কেমের কার্যালয় কুড়িল প্রগতি সরণী এলাকায় অবস্থিত। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের গোয়েন্দা দল পরবর্তীতে ওই কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে। সেখানে প্রতিষ্ঠানের আইটি ম্যানেজার মো. আব্দুল মোমিন পাটোয়ারীকে আটক করা হয়। তার প্রতিষ্ঠানে অভিযানে অভিযানে সর্বমোট ৬ লিটার রাসায়নিক পদার্থ ও কোনরূপ যাচাই-বাছাই ব্যতিরেকে আরও কিছু নিয়ন্ত্রিত প্রিকারসর কেমিক্যাল বিক্রির কাগজপত্র জব্দ করা হয়। অভিযানে ৬ লিটার রাসায়নিক পদার্থ জব্দ করা হয় এবং মো. আব্দুল মোমিন পাটোয়ারীকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের মালিকসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন পলাতক রয়েছে।
রাসায়নিকের বিষয়ে তিনি আরও জানান, প্রিকারসর কেমিক্যালগুলোর বৈধ ব্যবহার থাকলেও অবৈধ মাদক উৎপাদনে ব্যবহারের কারণে এগুলোর সরবরাহ ও ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবেও কঠোর নজরদারির আওতায় রয়েছে। বৈধ শিল্পকারখানা ও গবেষণাগারে ব্যবহৃত রাসায়নিক যেন অবৈধ মাদক তৈরির কাজে চলে না যায়, সে জন্য সরবরাহের উৎস, ক্রেতা, পরিমাণ এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে যথাযথ নজরদারি রয়েছে। বিশেষ করে এসিটিক এ্যানহাইড্রাইড হেরোইন তৈরির প্রক্রিয়ায় এবং পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট কোকেন তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হতে পারে। একইভাবে এসিটোন, ইথাইল ইথার, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, মিথাইল ইথাইল কিটোন ও টলুইনের মতো রাসায়নিকও অবৈধ মাদক উৎপাদনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হতে পারে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর জানিয়েছে, জাতিসংঘের ইউএনওডিসি এবং আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রিকারসর কেমিক্যাল কেনাবেচায় কঠোর নিয়ম অনুসরণের বিধান রয়েছে। বাংলাদেশেও অনুমতিপত্র ছাড়া এসব কেমিক্যাল অনলাইনে বা খোলাবাজারে কেনাবেচা সম্পূর্ণরূপে বেআইনি। ই-কেমের উদ্ধারকৃত নথিপত্রের ভিত্তিতে ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ও অনলাইন ক্রেতাদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। অপরাধীরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাদকের চোরাচালানের কৌশল বদলালেও অধিদপ্তরের সাইবার মনিটরিং ও প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে।