পবিত্র ১২ই রবিউল আউয়াল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত এক ঐতিহাসিক দিন। দিনটিকে কেন্দ্র করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন জাগে, ঈদে মিলাদুন্নবীতে কি বিশেষ কোনো নামাজ, রোজা বা নির্দিষ্ট কোনো আমল পালন করা বাধ্যতামূলক বা জরুরি?
কোরআন ও সহিহ হাদিসের সুস্পষ্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১২ই রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কোনো ফরজ, ওয়াজিব, বিশেষ রোজা, বা সংখ্যা নির্ধারিত কোনো জিকির-দরুদের নির্দেশ নেই। তবে মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ ও সিরাত চর্চাকে ইসলামে সর্বদা উৎসাহিত করা হয়েছে।
সুন্নাহর অনুকরণই নবীপ্রেমের মূল কথা
আল্লাহর ভালোবাসা ও ক্ষমা লাভের প্রধান শর্ত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ মেনে চলা। সূরা আল-আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতে মহানবী (সা.)-কে মুমিনদের জন্য ‘উত্তম আদর্শ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আর সূরা আলে ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতে তার অনুসরণের মাধ্যমেই আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের কথা বলা হয়েছে। কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তার সত্যবাদিতা, ইনসাফ ও ক্ষমাশীলতা দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করাই প্রকৃত ভালোবাসা।
অধিক পরিমাণে দরুদ ও সালাম পাঠ
কোরআনের সূরা আল-আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের রাসুল (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিস শরিফে এসেছে, যে ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার প্রতি ১০টি রহমত নাজিল করেন (সহিহ মুসলিম)। দিনটিতে নির্দিষ্ট সংখ্যা না বেঁধে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা একটি অন্যতম নেক আমল।
মহানবীর (সা.) সিরাত পাঠ ও জ্ঞান চর্চা
রবিউল আউয়াল মাসকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ জানার বিশেষ উপলক্ষ করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্য ও সন্তানদের তার মহান চরিত্র, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, নারী ও শিশুদের প্রতি তার মানবিক আচরণ এবং সিরাত শরিফ থেকে শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত উপকারী।
দান-সদকা ও অসহায়দের খাদ্যদান
দরিদ্রদের সাহায্য করা, দান-সদকা করা এবং ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া ইসলামে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। মিসরের বিখ্যাত ফতোয়া প্রতিষ্ঠান ‘দারুল ইফতা’র মতে, শরিয়তসম্মত উপায়ে কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও মানুষকে খাবার দেওয়ার মাধ্যমে মহানবীর (সা.) জন্মস্মরণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা বৈধ। তবে এসব নেক কাজ কেবল এই একদিনের জন্য নির্ধারিত নয়, যেকোনো দিনই তা পালনীয়।
১২ই রবিউল আউয়ালে বিশেষ রোজা ও আলেমদের মতভেদ
সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, মহানবী (সা.) প্রতি সোমবার রোজা রাখতেন এবং বলতেন,এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন ও তার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে। যেহেতু এটি সোমবারের রোজা সম্পর্কিত হাদিস, তাই কোনো নির্দিষ্ট তারিখে (যেমন বুধ বা অন্য কোনো বার) পড়লে সেটিকে ‘১২ই রবিউল আউয়ালের বিশেষ নির্ধারিত রোজা’ বলা শরিয়তসম্মত নয়।
অন্যদিকে, এ দিনে পৃথক ধর্মীয় উৎসব পালন নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। দারুল ইফতার মতে, শরিয়তের সীমা রক্ষা করে সিরাত আলোচনা, জিকির ও দোয়ার আয়োজন করা বৈধ। অপরদিকে সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ আবদুল আজিজ ইবন বাযসহ একাংশের মতে, রাসুল (সা.) বা সাহাবিদের যুগে বার্ষিক মিলাদুন্নবী উদ্যাপনের নজির না থাকায় একে বিশেষ ধর্মীয় উৎসব বানানো উচিত নয়।
নিয়মিত ফরজ ইবাদত ঠিক রেখে বেশি বেশি দরুদ পাঠ, সিরাত চর্চা, দান-সদকা ও মহানবীর (সা.) সুন্নাহকে নিজের জীবনে পুরোপুরি ধারণ করাই একজন মুমিনের প্রধান দায়িত্ব।