ঢাকা: ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর ভাবলাম, সন্তানরাই তো আমার শেষ বয়সের আশ্রয়। সেজন্য জমানো সবসহ জমি-জমা, ভিটে-মাটি ছেলে-মেয়েদের নামে লিখে দিলাম। ভেবেছিলাম মাথায় একটু ছাদ থাকবে, শেষ জীবনে দু’বেলা দু’মুঠো ডাল-ভাত পাব। কিন্তু আইনিভাবে সব হাতে পাওয়ার পর, ধীরে ধীরে ওরা ওদের জীবন গোছাতে লাগল। মেয়ে করে স্বামীর সংসার। আর ছেলের ঘরে আমি হলাম বউয়ের বোঝা। তাই একদিন নিজের বাড়ি থেকেই আমাকে বিদায় নিতে হলো। ঠাঁই মিলল এই বস্তিতে’— কথাগুলো বলতে বলতে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল রুকসানা বেগমের। ভাবতে অবাক লাগে, তিনি একদিন ছিলেন তিনতলা বিল্ডিংয়ের বিশাল বাড়িতে। সেই বাড়িটিতে আজ ছয়তলা ভবন হয়েছে। কিন্তু সেখানে ঠাঁই হয়নি রুকসানার।
রুকসানা বেগমের করুণ এই কাহিনী আমাদের সমাজে কোনো একক বা ব্যতিক্রম ঘটনা নয়। সন্তানের হাতে শেষ সম্বলটুকু তুলে দেওয়ার পর নিঃস্ব হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই হওয়া, কিংবা দূর দেশের রেলস্টেশন বা হাসপাতালের বেঞ্চে অসুস্থ ও বৃদ্ধ বাবা-মাকে ফেলে রেখে সন্তানদের পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য প্রায়ই গণ্যমাধ্যমের সংবাদ শিরোনামে উঠে আসে।
গত জুনেই পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছিল ঢাকার মিরপুরের মর্মান্তিক এক ঘটনা। একটি পরিবারের তিন সন্তান। যাদের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা (যুগ্ম সচিব), একজন শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সেই মায়ের নিথর দেহ ফ্ল্যাটের অন্ধকার ঘরে পড়ে রইল নিঃসঙ্গ অবস্থায়। পচে-গলে সাত দিন পার হয়ে গেল! সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানদের অহংকার আর প্রাচুর্যের অট্টালিকার আড়ালে তিলে তিলে নিভে গেল জন্মদাত্রীর জীবনপ্রদীপ।
আমাদের আধুনিক সমাজের এই নৈতিক অবক্ষয়, সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার পর প্রবীণদের চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অবহেলার হাত থেকে সুরক্ষায় এবার এক যুগান্তকারী আইনি সংস্কার এনেছে সরকার ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ (Transfer of Property (Amendment) Bill, 2026)।
নতুন আইনি সুরক্ষা ও সংসদের বার্তা
গত ২৭ আগস্ট আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বহুল আলোচিত এই বিলটি উত্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ নওশাদ জমিরের সভাপতিত্বে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিলটির বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সংশোধিত আকারে পাসের জন্য জোর সুপারিশ করা হয়।
বিদ্যমান ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে কাউকে সম্পত্তি দান করে দিলে সঙ্গে সঙ্গেই তার ওপর থেকে দাতার অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে সম্পত্তি হাতে পাওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে স্বজনদের মানসিকতা বদলে যায়।
প্রস্তাবিত নতুন আইনের ১২২-এ ধারায় জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান’ নামে একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি যুক্ত করা হচ্ছে। এর মূল কথা হলো ‘বাবা-মা, দাদা-দাদি, নাতি-নাতনি বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা দান নিবন্ধিত হলেও, দাতা যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন ওই সম্পত্তি ভোগদখল করার পূর্ণ আইনি অধিকার নিজের কাছেই রাখতে পারবেন।
সহজ কথায়, সন্তান বা স্বজনকে বাড়ি বা জমি লিখে দেওয়ার পরও জীবদ্দশায় দাতাকে কেউ নিজের ঘর থেকে উচ্ছেদ করতে পারবেন না। সম্পত্তির ভাড়া, ফসল বা বসবাসের অধিকার সম্পূর্ণ দাতার হাতেই থাকবে। দাতার মৃত্যুর পরই কেবল গ্রহীতা বা তার উত্তরাধিকাররা তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবেন।
শেষ বয়সের নিরাপত্তা ও নতুন আইনের বার্তা
আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো নতুন এই সংশোধনী বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, পিতা-মাতা, পিতামহ-মাতামহ, সন্তান, নাতি-নাতনি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা নিজে জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগদখল করতে পারবেন। সহজ কথায়, আপনি যদি জীবিত থাকা অবস্থায় আপনার সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দানও করেন, তবুও আপনার জীবদ্দশায় আপনাকে সেই বাড়ি বা জমি থেকে কেউ উচ্ছেদ করতে পারবে না। ওই সম্পত্তির ভাড়া, ফসল বা বসবাসের অধিকার সম্পূর্ণ আপনার হাতেই থাকবে।
নতুন বিলের মূল বার্তা
- দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ভোগাধিকার পাবেন।
- দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলেও ভোগাধিকার বহাল থাকবে।
- সব ধর্মের নাগরিকদের জন্য এই বিধান সমভাবে প্রযোজ্য হবে।
- প্রচলিত সাধারণ দান বা মুসলিম হেবা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
গ্রহীতার আগে দাতার মৃত্যু না হলে কী হবে?
যদি দাতা জীবিত থাকতেই গ্রহীতা মারা যান, তবে ওই সম্পত্তির কী হবে? প্রস্তাবিত বিলে এরও স্পষ্ট সমাধান দেওয়া হয়েছে। দাতার জীবদ্দশায় দান গ্রহণকারী ব্যক্তির মৃত্যু হলেও দাতার থাকার বা ভোগ করার অধিকার ব্যাহত হবে না। নিয়ম অনুযায়ী সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হবে ঠিকই, তবে দাতা যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন তিনিই তা ভোগ করবেন। দাতার মৃত্যুর পরেই কেবল গ্রহীতার ওয়ারিশরা তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবেন।
সব ধর্মের জন্য সমান সুরক্ষা
সংসদে বিল উত্থাপনের সময় স্পষ্ট করা হয়েছে, এটি ‘জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান’ নামে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র ও নতুন পদ্ধতি হিসেবে যুক্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো- এই আইনটি দেশের সব ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হবে। প্রচলিত সাধারণ দান বা মুসলিম আইনের অধীন ‘হেবা’ ব্যবস্থার ওপর এটি কোনো নীতিগত প্রভাব ফেলবে না বা সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করবে না।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
আইন পাসের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তবে শুধু আইন প্রণয়নই নয়, এর প্রয়োগ ও জনসচেতনতার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ALRD)-এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা সারাবাংলাকে বলেন, ‘আইনটি পাস হলে অবশ্যই জনগণের জন্য একটি পজিটিভ বার্তা যাবে। কারণ, অনেক পিতামাতা বা দাদা-দাদি সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর গৃহত্যাগ করে একাকী জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। সেই জায়গায় এটি বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার আইনটি করলে অনেক প্রশংসনীয় কাজ হবে। আইনটি কার্যকর হলে বৃদ্ধ বয়সে স্বজনদের দ্বারা প্রতারিত বা অবহেলিত হওয়ার ভয় অনেকাংশে কমবে। সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় যারা সন্তানকে আইনিভাবে কিছু বুঝিয়ে দিতে দ্বিধায় থাকতেন, তারাও এখন নিশ্চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আইনি সুরক্ষার এই নতুন ছাতা প্রবীণদের শেষ জীবনকে করবে আরও নিরাপদ ও সম্মানজনক।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আইন পাস হওয়ার পর এর ব্যাপক প্রচারও চালাতে হবে। কারণ, তৃণমূলের সাধারণ মানুষ যদি না জানে, তবে ভুক্তভোগীরা এর সুফল পাবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমের পাশাপাশি ছোট নাটিকা ও রেডিও প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।’
অন্যদিকে কর্মজীবী নারী সংগঠনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফারহানা তিথি আইন বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিল পাস হওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু আমাদের দেশে আইন হলেও বাস্তবায়ন কম। যদি সঠিক বাস্তবায়ন হয়, তবে কাউকে সবকিছু হারিয়ে দেউলিয়া হতে হবে না। তাই বিল পাস করে ফেলে না রেখে, দ্রুততম সময়ে এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’
শেষ জীবনের নিশ্চিত ছায়া
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনি সুরক্ষার এই নতুন ছাতা কেবল একটি বিধিবদ্ধ আইনের অনুচ্ছেদ নয়, বরং তা আমাদের ভেঙে পড়া সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক শ্রদ্ধাবোধ পুনরুদ্ধারের এক আশাব্যঞ্জক প্রয়াস। সন্তানের হাতে জীবন সায়াহ্নে নিঃস্ব হওয়ার যে চাপা আশঙ্কা এতদিন প্রবীণদের কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে, তা দূর করতে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ হতে পারে এক বিশ্বস্ত আশ্রয়।