Sunday 16 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

স্বাধীনতার ৪৯ বছর: কেমন আছে এ দেশের নারীরা?


২৬ মার্চ ২০২০ ১০:০০ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২০ ১১:১৮
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

স্বাধীনতার ৪৯ বছর অতিক্রম করছি আমরা। একাত্তরে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তার আকঙ্ক্ষা ছিল নারী-পুরুষ, শিশু-বয়স্ক নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতা। মুক্তিযোদ্ধারা স্বপ্ন দেখেছিল শোষণ ও বৈষম্যহীন একটি মানবিক সমাজের। তাদের দেখা সেই স্বপ্নের সমাজে স্থান পায়নি অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় বৈষম্য, এমনকি লিঙ্গ বৈষম্যও। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরেও কি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে?

আজকের এই বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমরা বলতে পারি, ক্ষমতাধর অনেক জায়গাতেই নারীর পদায়ন ঘটেছে। কিন্তু নারীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, স্বীকৃতি, নিরাপত্তা— এগুলোও কি অর্জিত হয়েছে? পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও নারীর অবদানের স্বীকৃতি কতটা? দেশের নীতি-নির্ধারণী কিংবা সামাজিক পর্যায়ে নারীর মর্যাদা কতটুকু?

বিজ্ঞাপন

৪৯ বছরের স্বাধীনতায় নারীর সার্বিক অবস্থা নিয়ে কথা হয় বিশিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। সারাবাংলার সঙ্গে আলাপচারিতায় তারা তুলে ধরেছেন তাদের মতামত।

স্বাধীন দেশে নারী স্বাধীনতা প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক আনু মুহাম্মদ বলেন, নারী স্বাধীনতা দেশের সামগ্রিক স্বাধীনতার সঙ্গেই যুক্ত। দেশের জনগণ যদি শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জ্ঞানে পিছিয়ে থাকে তাহলে নারীও পিছিয়ে থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। সেই সুরেই বলা যায়, আমাদের দেশের জনগণ কর্মসংস্থান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোই অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। এই অবস্থায় নারী-পুরুষ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে কোণঠাসা অবস্থায় পড়ে যাচ্ছে নারী। কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সবক্ষেত্রেই নারীর ওপর দায় চাপানো হয়। নারীর ভূমিকাকে করা হয় অবদমিত।

আনু মুহাম্মদ বলেন, নারীর ওপর যৌন সহিংসতা তো আছেই। তাছাড়া সংঘাত, যুদ্ধ, ক্রসফায়ার, গুম ইত্যাদি ঘটনাগুলোতে নারীকেই বেশি দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। ফলে আমাদের দেশে এমন এক অরাজকতা বিরাজ করছে, যেখানে নারী-পুরুষ উভয়ই আছে চরম অনিরাপত্তায়। তবে পুরুষশাসিত এই সমাজে নারীদের দুর্দশা নিঃসন্দেহে বেশি। ফলে স্বাধীনতার ৪৯ বছরে দেশের জিডিপি বেড়েছে, জৌলুস বেড়েছে। তবে নারী-পুরুষের সমতা তথা মানুষের মুক্তি অর্জিত হয়নি।

নারী স্বাধীনতার অবস্থান মানবসমাজের মধ্যেই বলে মনে করে লেখক ও অধ্যাপক ড. মালেকা বেগম। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, গোটা পৃথিবীর মানব মুক্তির সঙ্গেই নারীমুক্তি ও নারী স্বাধীনতার বিষয়টি যুক্ত। নারী স্বাধীনতা কোনো ‘দেশের’ স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং সারাবিশ্বের মানুষের স্বাধীনতার সঙ্গেই যুক্ত। কার্ল মার্কস, অ্যাঙ্গেলসের মতে, এই সমাজ একসময় ছিল মাতৃপ্রধান। পরে সেই ব্যবস্থা ভেঙে গেল। সেই স্থান দখল করে নিল পুরুষতন্ত্র।

আমাদের দেশের নারীরা কেমন আছে?— জানতে চাইলে অধ্যাপক মালেকা বেগম বলেন, গোটা পৃথিবীতে নারীরা যেভাবে শোষিত ও নির্যাতিত হচ্ছেন, আমাদের এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। নারীরা অনেকদিক থেকে এগিয়ে গেলেও এখনো তাদের মানুষ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ততটা নেই। যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ— এগুলো তো প্রতিনিয়তই হচ্ছে।

নারীদের এই দুর্দশার কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই গলদ আছে। শুধু টেকনিক্যাল পড়ালেখার ওপর এখন গুরুত্ব দেওয়া হয়। জীবন, জগৎকে সত্যিকার অর্থে জানার জন্য যে জ্ঞান দরকার, সেই ব্যাপারে তেমন গুরুত্ব নেই।

নিজের অতীত টেনে এই অধ্যাপক বলেন, একটা সময় যখন আমরা ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তখন অনেক ছেলের সঙ্গে কাজ করেছি। কখনো কোনো ছেলেকে মেয়েদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে দেখিনি। এখন দেখি বাবা কিংবা ভাইয়ের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে মেয়েরা। আমাদের সময়কার সেই পুরনো মূল্যবোধটুকুও এখন আর নেই।

নারী-পুরুষের এমন বৈষম্যের পেছনে সবারই দায় আছে বলে মনে করেন মালেকা বেগম। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা দরিদ্র নারীদের কথা কতটুকু জানি কিংবা তাদেরকে সামনে কতটুকু নিয়ে আসতে চাই? অনেকে ভাবেন, নারীরা দুর্বল। তারা পুরুষের মতো দক্ষ হতে পারছেন না। এটা কেবল নারীর ব্যর্থতা। কিন্তু আসলে তা নয়। একজন নারী কত সমস্যার মধ্য দিয়ে দিন কাটায় তা আমরা গভীরভাবে ভেবেই দেখি না।

নারী-পুরুষের এই বৈষম্য ঘোচানোর উপায় সম্পর্কে ড. মালেকা বেগম বলেন, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এখন মনুষ্যত্ব অর্জন করার লড়াই করতে হবে। মানুষের মুক্তি হলে তবেই নারী স্বাধীনতা অর্জিত হবে।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর পদায়ন হলেও সমাজে নারী-পুরুষ বৈষম্য রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন প্রখ্যাত অভিনেতা ও নির্মাতা রামেন্দু মজুমদার। তিনি বলেন, আপন দক্ষতায় নারীরা এগিয়ে গেছে। মেধা কিংবা দক্ষতা— কোনো দিক থেকেই নারী এখন আর পিছিয়ে নেই। তারপরও নারী-পুরুষের বৈষম্য তো আছেই।

লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার জন্য নারী-পুরুষ উভয়কে সোচ্চার হতে হবে বলে মনে করেন রামেন্দু মজুমদার। তিনি বলেন, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে হলে প্রথমত পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হওয়া দরকার। পরিবার থেকে শুরু করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষকে সমান যোগ্য বলে মনে করতে হবে। সমান অধিকার ও সুযোগ দিতে হবে।

‘নারীদেরও অধিকার সচেতন হওয়া দরকার। নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে। সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে হবে। রুদ্ধ থাকা পথগুলো খুলে ফেলতে হবে,’— মন্তব্য রামেন্দু মজুমদারের।

বিজ্ঞাপন

আরো