গ্রাম-বাংলার খাল-বিল থেকে কুড়িয়ে আনা সাদা-গোলাপি শাপলা বর্ষা বা শরতের দিনে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে শাপলা-চিংড়ি কিংবা শাপলা-সরিষার চচ্চড়ি বাঙালির খাবারের থালায় এক অন্যরকম নস্টালজিয়া তৈরি করে। তবে অনেকেরই সাধারণ একটি অভিযোগ থাকে, রান্না করার পর শাপলা থেকে প্রচুর পানি বের হয়ে তরকারি পানসে হয়ে যায় কিংবা গলে গিয়ে কাদা-কাদা রূপ নেয়। সত্যি বলতে, সামান্য কিছু কৌশল আর রান্নার সঠিক নিয়ম জানা থাকলে অতি সাধারণ এই শাপলা দিয়েও রাজকীয় স্বাদের পদ তৈরি করা সম্ভব। আসুন জেনে নেই, শাপলা রান্নায় স্বাদ বাড়ানোর গোপন রাজকীয় কৌশল …
শাপলার আসল স্বাদ বজায় রাখা অনেকটাই নির্ভর করে এটি কাটার ওপর। শাপলার ডাঁটা টুকরো করার পর ওপরের পাতলা সবুজ আঁশটি খুব যত্ন নিয়ে ছাড়িয়ে নিতে হবে। এই আঁশ থেকে গেলে মসলা ভেতরে ঢুকতে পারে না এবং খাওয়ার সময় খসখসে লাগে। ডাঁটা কাটার পর ধুয়ে সামান্য লবণ মাখিয়ে মিনিট ১৫ রেখে দিলে শাপলার ভেতরের অতিরিক্ত পানি বের হয়ে আসে। এরপর আলতো করে চেপে পানি ঝরিয়ে নিলে রান্নার পর তরকারি আর পানসে লাগবে না। চাইলে শাপলা ফুটন্ত পানিতে এক বলক তুলে পানি ছেঁকেও নেওয়া যায়, তবে কোনোভাবেই বেশিক্ষণ ফোটানো যাবে না। শাপলার একটি নিজস্ব মচমচে ভাব থাকে, যা ধরে রাখতে ঢাকনা ছাড়া দ্রুত সেদ্ধ করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
শাপলা একাকী রান্না করার চেয়ে চিংড়ি, ইলিশ কিংবা শুঁটকির সঙ্গে রান্না করলে এর স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যায়। ছোট বা মাঝারি সাইজের চিংড়ি সামান্য হলুদ-লবণে হালকা ভেজে শাপলায় দিলে চমৎকার এক নোনতা-মিষ্টি স্বাদের সামঞ্জস্য তৈরি হয়। আবার ইলিশের মাথা কিংবা লেজের অংশ দিয়ে শাপলার মাখো-মাখো ঘণ্টা বানালে তো কথাই নেই, এর সুবাসে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে এক অপরূপ তৃপ্তি। যারা একটু ঝাল ও ঝাঁঝালো খাবার পছন্দ করেন, তারা প্রচুর পেঁয়াজ-রসুনের সঙ্গে চ্যাপা বা লইট্টা শুঁটকি দিয়ে শাপলার চচ্চড়ি বানিয়ে নিতে পারেন।
সরিষা, কোরানো নারিকেল কিংবা তিল বাটার ব্যবহার শাপলার তরকারিতে দারুণ গাঢ় স্বাদ ও থকথকে ভাব এনে দেয়। কাঁচামরিচ ও লবণ দিয়ে সরিষা বাটলে তা তেতো হওয়ার ভয় থাকে না, আর নারিকেলের মিষ্টতা শাপলার পানসে ভাব পুরোপুরি কাটান দেয়। নিরামিষ রান্নায় পোস্ত বাটা ও কাঁচামরিচ দিয়ে চচ্চড়ি করে শেষ মুহূর্তে সামান্য লেবুর রস বা কাঁচা আম দিলে স্বাদে অসাধারণ এক মাত্রা যুক্ত হয়। শাপলা রান্নার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোপন কৌশলটি হলো এটি কখনোই ঢেকে রান্না করা যাবে না। খোলা কড়াইয়ে দ্রুত রান্না করলে শাপলার ভেতরের সতেজ রং এবং মচমচে ভাব, দুটোই পুরোপুরি বজায় থাকে।