Sunday 16 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মাস্ক ও পিপিই ব্যবহারের সঠিক নিয়ম জানেন তো?


২৯ এপ্রিল ২০২০ ১১:২৫ | আপডেট: ১৯ মে ২০২০ ১৪:৫৭
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকতে মাস্ক ব্যবহার সবার জন্য বাধ্যতামূলক ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী পিপিই ব্যবহারের নির্দেশ আছে।

তবে মাস্ক ও পিপিই শুধু যেনতেনভাবে ব্যবহার করলেই চলবে না। যথাযথ নিয়ম মেনে ব্যবহার করতে হবে। তা না হলে এসব ব্যবহারের পরও সুস্থ ব্যক্তি কোভিড-১৯ দ্বারা সংক্রমিত হতে পারেন।

আসুন জেনে নেই, মাস্ক ও পিপিই ব্যবহারের সঠিক নিয়ম-

মুগদা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. রাহনুমা পারভীন বলেন, ‘একেক ধরনের মাস্ক একেক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। যেকোন ভালোমানের মাস্ক ধুলোবালি থেকে সুরক্ষা জোগায় এবং রোগাক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে জীবাণু ছড়াতে বাধা দেয়। তবে এন-৯৫ মাস্ক অতিক্ষুদ্র আকারের জীবাণু, বাতাসের ও কলকারখানার সূক্ষ ধূলিকণা ইত্যাদি প্রতিরোধে বেশ কার্যকর। এছাড়াও বাজারে এন-৯৫ এর মতো কেএন-৯৫ মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, দুটো মাস্কের গুণাগুণ প্রায় একইরকম।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘আরেকটি হলো সার্জিক্যাল মাস্ক। এই মাস্কের দুটি বা তিনটি বিশেষ লেয়ার থাকে। ফলে সার্জিক্যাল মাস্কও ভালো সুরক্ষা জোগায়।আর অন্যান্য যেসব মাস্ক বাজারে পাওয়া যাচ্ছে এগুলো সুস্থ ব্যক্তিকে জীবাণু থেকে কতটা সুরক্ষা দিতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে, তবে রোগাক্রান্ত ব্যক্তি যদি সবসময় মাস্ক পরে থাকেন, তাহলে তা জীবাণু ছড়ানো রোধ করতে সাহায্য করবে।অন্যান্য দেশে এন-৯৫ মাস্ক ব্যবহারের আগে ফিটনেস টেস্ট করা হয়। অর্থাৎ মুখের আকৃতির সঙ্গে যে মাস্ক পুরোপুরি এঁটে যায়, সেই মাস্ক সরবরাহ করা হয়। কারণ একেকজনের মুখায়ব একেকরকম হবে। আর মাস্ক ফিট না করলে তা কোনভাবেই জীবাণু থেকে সুরক্ষা দিতে পারবে না। আর প্রতিবার এই মাস্ক পরার পর অবশ্যই সিল চেক করে নিতে হবে।আমাদের দেশে ফিট টেস্ট করানোর সুবিধা অপ্রতুল।’

ডা. রাহনুমা পারভীন বলেন, ‘এন-৯৫ মাস্ক সর্বোচ্চ ৮ ঘন্টা ব্যবহার করা যায় এবং কেএন-৯৫ মাস্ক সর্বোচ্চ ৪ ঘন্টা ব্যবহার করা উত্তম। তবে বলা হয়ে থাকে যেকোন মাস্কই যদি কোন বডি ফ্লুইড দ্বারা ভিজে যায় কিংবা ময়লা হয়ে যায় তাহলে সাথে সাথে পরিবর্তন করতে হবে।সার্জিকাল মাস্ক নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে, তবে একবার খুলে ফেললে সেটা ফেলে দিতে হবে।বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মাস্কের তীব্র সংকটের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে এন৯৫ মাস্ক জীবাণুমুক্ত করে পুনঃব্যবহারের কিছু নিয়মকানুন ঘোষিত হয়েছে।তবে তা কেবলমাত্র ব্যবহারের পর কোনভাবে নষ্ট না হওয়া এবং কোভিড রোগীর এরোসল সৃষ্টিকারী কোনকাজে ব্যবহৃত না হলেই প্রযোজ্য হবে।একটি এন৯৫ মাস্ক জীবাণুমুক্ত করে সর্বোচ্চ ৫ বার ব্যবহার করা যাবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘নন ওভেন ফেব্রিক দিয়ে বানানো পিপিই সবচেয়ে নিরাপদ। সম্ভব হলে কোভিড রোগীর চিকিৎসার জন্য ওয়ানটাইম ইউজ পিপিই ব্যবহার করা উত্তম। সাধারণ মানুষের সবার জন্য পিপিই ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক নয়। যখন আমরা বাজারে যাই বা টুকটাক কাজে বাইরে বের হই তখন ভালোমানের মাস্ক ও গ্লাভস পরলেই যথেষ্ট তবে ঘরে ফেরার পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। পোশাকও পালটে ফেলতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য এবং যারা সংক্রণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পেশাতে আছেন, তাদের কর্মক্ষেত্রে পিপিই পরা জরুরী। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে, যখন কোন স্বাস্থ্যকর্মী কোন রোগী দেখবেন, তখন করোনার সন্দেহ মাথায় রেখেই তাকে রোগী দেখতে হবে। এছাড়াও তারা যখন শণাক্ত হওয়া করোনা রোগী দেখবেন, করোনাভাইরাস টেস্ট করবেন, আইসোলেশনে থাকা রোগীকে দেখবেন এবং আইসিইউ বা নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকবেন তখন পিপিই পরা জরুরী। মনে রাখা ভালো, পিপিই পরা ও বিশেষ করে খোলার সঠিক নিয়ম জানতে হবে। তা না হলে পিপিই ব্যবহার করলেও করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, মাস্ক পরার আগে অবশ্যই হাত সাবান দিয়ে ধুতে হবে। মাস্ক ব্যবহারের সময় হাত দিয়ে স্পর্শ করা যাবে না। মাস্ক খোলার আগেও সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। মাস্ক খুলে ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হবে।

এছাড়া পিপিই পরাও নিয়ম আছে। আইসোলেশন বা স্যাম্পল কালেকশন করতে হলে পুরো পিপিই পরতে হবে। ডিরেকটর জেনারেল অফ হেলথ সার্ভিস বা ডিজিএইচএস এর পরামর্শ অনুযায়ী-

পিপিই পরার নিয়ম

পিপিই পরার পদ্ধতিকে বলা হয় ডনিং। পিপিই পরতে হবে যেভাবে-

প্রথমে হাত ধুয়ে নিতে হয়। তারপর হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে নিতে হবে। হাতের ওপরে এবং আঙুলের ফাঁকে, আঙুলের পেছনের উঁচু জায়গা এবং বুড়ো আঙুলের পেছনের ভালো করে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এরপর হাতের কবজি একইভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে।

একটি পিপিই সেটে থাকে- গাউন, পলি এপ্রোন, অ্যালকোহল প্যাড, সু কাভার, গ্লাভস ২ জোড়া, এন-৯৫ মাস্ক, চশমা বা গগলস।

প্রথমে এক জোড়া গ্লাভস পরে নিতে হবে। এসময় খেয়াল রাখতে হবে, গ্লাভস হাতে ফিট করে কিনা। যার হাতে যেটা ফিট করে সেটাই পরা উচিত। এজন্য আগে থেকেই হাতের মাপ সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে।

এরপর গাউন পরতে হবে। চেষ্টা করতে হবে গাউন যেন মাটির মধ্যে না লাগে। এজন্য গুটিয়ে গাউন পরতে হবে। গাউনের ক্যাপ আগেই পরা যাবে না। এরপর মাস্ক পরে নিতে হবে। মাস্কের বাইরের অংশে হাত লাগিয়ে পরতে হবে। মাস্ক পরার পর নাকের ওপরের সিল করা অংশ হাত দিয়ে চেপে বসাতে হবে, যাতে মাস্ক ভালোভাবে বসে যায়। এরপর গগলস পরতে হবে। যারা চশমা পরেন তারা চশমা পরার পর গগলস পরবেন। গগলসের দুইপাশে থাকা ফিতার মতো অংশ ভালোভাবে টেনে নিতে হবে। এতে সেটি ভালোমতো ফিট হয়ে যাবে। এরপর গাউনের ক্যাপ দিয়ে মাথা ঢেকে নিতে হবে। গগলসের ওপরে দুটি বাটন আছে। এতে গাউনের ক্যাপ ভালোভাবে বসিয়ে নিতে হবে।

অনেকসময় গাউন পরার পর গলার অংশে একটু ফাঁক থাকতে পারে। তখন মাইক্রোপোর দিয়ে জায়গাটি বন্ধ করে দিতে হবে। গাউন পরার পর সু কাভার পরে নিতে হবে। এরপর অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য পলি এপ্রোন গাউনের ওপর পরতে হবে। পলি এপ্রোন পেছনে বেঁধে নেবেন। এখন আরেকটি গ্লাভস পরতে হবে। অর্থাৎ দুইটি গ্লাভস পরতে হবে। গ্লাভস পরার পর হাতের কবজির অংশ ফাঁকা থাকলে আরেকটি মাইক্রোপোর দিয়ে ফাঁকা জায়গা বন্ধ করে নিতে হবে।

তবে রোগীর কাছে যাওয়ার আগেই পিপিই খোলার জায়গা বা ডফিং এরিয়া ঠিক করে নিতে হবে। এজন্য বায়ো হ্যাজার্ড ব্যাগ লাগবে। এই ব্যাগটি একটি বিনের ওপর সাজিয়ে নিতে হবে।

পিপিই খোলার সময় যা যা লাগবে

হাইপোক্লোরাইট দ্রবণ

গ্লাভস

সার্জিক্যাল মাস্ক

বায়ো হ্যাজার্ড ব্যাগ

স্যানিক্লথ

পিপিই ব্যবহারের পর ডফিং এরিয়াতে এসে স্যানিক্লথ দিয়ে গ্লাভস এবং সুকাভার প্রথমে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এবার সু কাভার খুলতে হবে। পেছন দিক থেকে সু কাভার খুলে নিতে হবে। এরপর বিনে ফেলতে হবে। এরপর পলি এপ্রোন খুলতে হবে। পলি এপ্রোন মাথার পেছন থেকে ধরে সামনে এনে খুলতে হবে। পলি এপ্রোনের বাইরের দিকটা ভেতরে ঢুকিয়ে ভাঁজ করে বিনে ফেলতে হবে। এরপর হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে আবার হাত পরিষ্কার করে নিতে হবে।

এবার প্রথম গ্লাভসটি খুলতে হবে। গ্লাভসের বাইরের অংশ যেন ভেতরের দিকে থাকে সেভাবে খুলতে হবে।

পিপিই খোলার সময় খেয়াল রাখতে হবে, শরীরে যেন কোন স্পর্শ না লাগে। প্রথমে গাউন ও হাতের মাইক্রোপোর খুলে নিতে হবে। সেগুলো বিনে ফেলতে হবে। এরপর গাউনের চেইন খুলে মাথার ক্যাপ খুলতে হবে। গাউনের হাত উল্টে ভেতরের দিকে রাখতে হবে।

মনে রাখা ভালো, গাউনের বাইরের দিকটি জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত ও ভেতরের দিকটি পরিষ্কার। গাউন ওপর থেকে এমনভাবে খুলতে হবে যাতে বাইরের অংশটি ভেতরে ঢুকে যায় এবং রোল করে খুলতে হবে যাতে মেঝেতে গাউন স্পর্শ না করে। গাউন বিনে ফেলে দেওয়ার পর অ্যালকোহল প্যাড দিয়ে আবার হাত পরিষ্কার করে নিতে হবে।

এরপর গগলস খুলতে হবে। গগলস সামনে একহাত দিয়ে ধরে পেছনে ফিতা খুলে নিতে হবে। এবার হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে আবার হাত পরিষ্কার করে মাস্ক খুলতে হবে। মাস্ক খোলার সময় একহাত দিয়ে মাস্কের বাইরের অংশ চেপে ধরে আরেক হাত দিয়ে একটি একটি করে ফিতা খুলতে হবে। এবার মাস্কও বিনে ফেলে দিন।

আবার অ্যালকোহল প্যাড দিয়ে হাত মুছে সবশেষে দ্বিতীয় গ্লাভসটিও খুলে বিনে ফেলে দিন। যে বায়ো হ্যাজার্ড ব্যাগে এগুলো ফেলা হল সেটি বন্ধ বা সিল করে দিতে হবে এখন। এই কাজটিও নিজেকেই করতে হবে। এই ব্যাগ অন্য কেউ বন্ধ করলে তিনিও সংক্রমিত হতে পারেন।

বায়ো হ্যাজার্ড ব্যাগ বন্ধ করার আগে আরেক জোড়া গ্লাভস ও সার্জিক্যাল মাস্ক পরে নিতে হবে।

এরপর ব্যাগের মধ্যে ১% হাইপোক্লোরাইড দ্রবণ ফেলে দিন। এই ব্যাগ বন্ধ করার সময় মুখ দূরে রাখতে হবে। ব্যাগে ভালো করে প্যাঁচ দিয়ে গিট দিতে হবে। সতর্কতা হিসেবে ব্যাগের বাইরের দিকেও খানিকটা হাইপোক্লোরাইড স্প্রে করে দিন। এরপর বিনে রেখে দিতে হবে, যাতে পরবর্তীতে ক্লিনার এসে এটা নিয়ে যেতে পারে।

সবশেষে যে মাস্ক ও গ্লাভসটি ব্যবহার করেছেন সেগুলো আরেকটি বায়ো হ্যাজার্ড ব্যাগে ফেলে দিন। হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বায়ো হ্যাজার্ড ব্যাগ পুড়িয়ে ফেলতে হবে বা মাটি চাপা দিতে হবে।