Monday 17 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

হারানো সোনালী দিনগুলি…

কবীর আহমেদ ভূঁইয়া
১৭ আগস্ট ২০২৬ ১৫:১২

[তৃতীয় পর্ব]

বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেরই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। কিন্তু আমার কাছে বরিশাল, শ্যামনগর, কোড্ডা, কোড়াবাড়ী, চান্দী, দুর্জয়নগর, বৈষ্ণবপুর, ভবানীপুর, বনগজ ও কৃষ্ণনগর—এই বিস্তীর্ণ জনপদের সৌন্দর্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগত। প্রকৃতি যেন নিজের সমস্ত রূপ, রস আর গন্ধ ঢেলে সাজিয়েছিল এই ভূখণ্ডকে। আজও চোখ বন্ধ করলেই সেই অপরূপ দৃশ্য আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ বিল, বোয়ালিয়া বিল ও কাইজলা বিল যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেত। চারদিকে শুধু অথৈ জলরাশি। যতদূর চোখ যেত, মনে হতো যেন এক বিশাল সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে আছি। ভবানীপুর থেকে ওঠা ঢেউ ছুটে যেত কোড্ডা রেললাইন পর্যন্ত। বাতাসের তালে তালে সেই ঢেউয়ের নৃত্য দেখে মনে হতো, এ কোনো সাধারণ বিল নয়—এ যেন বঙ্গোপসাগরেরই হারিয়ে যাওয়া এক অংশ।

বিজ্ঞাপন

আষাঢ়, শ্রাবণ আর ভাদ্র— এই তিন মাস ছিল আমাদের জনপদের ভরা যৌবন। বর্ষা এলেই গ্রামের জীবন পানির সঙ্গে একাকার হয়ে যেত। গ্রামের পূর্ব দিকের বোয়ালিয়া বিল পেরিয়েই আমাদের আখাউড়া যেতে হতো। ভরা বর্ষায় উত্তাল ঢেউ ঠেলে ছোট ছোট নৌকায় মানুষ প্রতিদিন জীবন-জীবিকার তাগিদে যাতায়াত করত। ঢেউ কখনো ভয় দেখাত, কখনো সাহস শেখাত।

আমাদের গ্রামের মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন মাঝিরা। কুষা, মরখুশ, সরেঙ্গা, ডিঙ্গি—কত রকমের নৌকাই না চলত! কোথাও বাঁশের চহির দিয়ে নৌকা ঠেলে এগিয়ে নেওয়া হতো, আবার গভীর পানিতে বৈঠা ও দাঁড়ের ছন্দে মাঝিরা ঢেউ কেটে পথ তৈরি করতেন। অনুকূল বাতাস পেলেই পাল তুলে নৌকা ছুটে যেত দূর গন্তব্যে। মাঝির কণ্ঠে ভেসে আসা ভাটিয়ালি আর জলের কলতান—দুটো যেন একই সুরের দুই রূপ।

বর্ষা শুধু চলাচলের মাধ্যম বদলাত না, বদলে দিত মানুষের জীবনযাত্রার ছন্দও। গ্রামের বিয়ে-শাদিতে ছইওয়ালা নৌকা ফুল আর রঙিন কাপড়ে সাজিয়ে বরযাত্রীরা কনের বাড়ি যেতেন। দূর থেকে বৈঠার ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ শুনলেই সবাই বুঝে যেত—আজ কোনো শুভ দিনের উৎসব।

আশ্বিন ও কার্তিক মাসে যখন ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করত, তখন বিল যেন তার গুপ্তধনের ভাণ্ডার খুলে দিত। সাদা-লাল শাপলা, শালুক, লামকলা, পানিফল, সিঙরা, ভেড্ডা— প্রকৃতি অকৃপণ হাতে গ্রামের মানুষকে দান করত তার অমূল্য সম্পদ।

ভোরের আলো ফুটতেই শত শত হাঁস লামকলার ঝোপে ছড়িয়ে পড়ত। সারাদিন পেট ভরে খেয়ে সন্ধ্যা হলে তারা আবার নিজ নিজ ঘরে ফিরে আসত। হাঁস পালনকারীদের মুখে তখন তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠত। কারণ তারা জানতেন, প্রকৃতির এই অফুরন্ত দানই পরদিন আরও বেশি ডিমের নিশ্চয়তা এনে দেবে। গ্রামের অর্থনীতির এই ছোট ছোট সুখই ছিল মানুষের বড় আনন্দ।

দক্ষিণ বিল, বোয়ালিয়া বিল ও কাইজলা বিল ছিল জেলেদের কর্মভূমি। মাছ ধরা ছিল শুধু জীবিকা নয়—ছিল এক শিল্প। হরেক রকম জাল, চাই, বরশি, ফাঁদ—প্রতিটি যন্ত্রের ছিল আলাদা ব্যবহার। পানি কমে এলে বরাজাল, বড়া পাতা, সিটকি পাতা ও লাট টেনে মাছ ধরার দৃশ্য ছিল চোখজুড়ানো। অভিজ্ঞ জেলেরা পানির ঢেউ, বাতাসের গতি আর মাছের চলন দেখেই বুঝে যেতেন কোথায় জাল ফেললে সাফল্য মিলবে।

আমাদের গ্রামের আফরোজ কাকা, সরকার বাড়ির মোহাম্মদ, ফরিদ, রহিম কাকা, মান্দির বাড়ির আব্বাসী ভাই—তারা ছিলেন এই শিল্পের দক্ষ কারিগর। তাদের সঙ্গে ছিলেন সুলতান কাকা, যিনি পানির নিচে ডুব দিয়ে খালি হাতে মাছ ধরার অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। যেন পানির নিচে লুকিয়ে থাকা মাছও তার হাতকে চিনে নিত। তাদের মতো আরও অসংখ্য নাম না-জানা জেলে দিনের পর দিন দক্ষিণ বিল, বোয়ালিয়া বিল ও কাইজলা বিল থেকে জীবিকার অন্ন সংগ্রহ করতেন। তাদের পরিশ্রম আজও আমার হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধা জাগায়।

মাছ ধরতে গিয়ে অনেকে কৌশলে বালিহাঁসও শিকার করতেন। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই নিবিড় সম্পর্ক ছিল গ্রামবাংলার সহজ-সরল জীবনের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।

বর্ষায় কচুরিপানার বিশাল স্রোত অনেক সময় বাড়িঘর ভেঙে দেওয়ার উপক্রম করত। তখন চৌধুরী বাড়ির হান্নান ভাই, আলিম ভাই ও রহিম ভাই কচুরিপানা আটকানোর জন্য বাঁধ তৈরি করতেন। শুধু নিজেদের বাড়িই নয়, প্রতিবেশীদের বাড়িও রক্ষা করতেন। তখন প্রতিবেশী মানেই ছিল আত্মীয়; একজনের বিপদ মানেই সবার দায়িত্ব।

আমাদের গ্রাম থেকে আখাউড়া যাওয়ার প্রধান ভরসা ছিলেন পশ্চিমপাড়ার শিশু ভাই, সোনামিয়া দাদা, লুক্কু ভাই, সবজো কাকা, লুহু কাকা মান্দির বাড়ির আব্বাস ভাই, জালাল ভাই, আব্দুল হাসিম কাকা, বেপারী বাড়ীর আবু সামা ভাই চৌধুরী বাড়ির মালেক ভাই, খালেক ভাই ও রাজ্জাক। তারা শুধু নৌকা চালাতেন না; তারা ছিলেন মানুষের আস্থার প্রতীক। ঝড়, বৃষ্টি, রোদ কিংবা গভীর রাত—যখনই প্রয়োজন হয়েছে, তারা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

সেই সময় আখাউড়া যেতে নৌকা ভাড়া ছিল মাত্র পঞ্চাশ পয়সা। কিন্তু মানুষের কষ্ট বুঝে ইদ্রিস ভাই, মেম্বার নির্বাচিত হওয়ারও আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন—ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে মাত্র পঁচিশ পয়সা। তার এই ছোট্ট মানবিক উদ্যোগ অসংখ্য দরিদ্র শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনকে সহজ করে দিয়েছিল। আজও তার সেই মহানুভবতার কথা মনে পড়লে হৃদয় শ্রদ্ধায় নত হয়ে যায়।

আখাউড়া থেকে নবীনগর পর্যন্ত চলত বিখ্যাত ‘গন্যা নৌকা’ সার্ভিস। প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রী এই নৌকায় যাতায়াত করতেন। বিস্ময়ের বিষয়, একই পরিবারের সাত ভাই পালাক্রমে সেই নৌকা চালাতেন। তাদের ঐক্য, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ ছিল গোটা এলাকার মানুষের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এরপর আসত অগ্রহায়ণ, পৌষ ও মাঘ—মাছের প্রাচুর্যের ঋতু। তখন মনে হতো, এ জনপদে যেন পানি আর মাছ একসঙ্গে বসবাস করছে। বিলে নামলেই মাছ, জালে ফেললেই মাছ। মানুষ নিজের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করত, আবার ভবিষ্যতের জন্য মাছ শুকিয়ে শুটকি বানিয়ে সংরক্ষণ করত।

উত্তরপাড়ার সালাম ভাইসহ অনেকেই ছিলেন শুটকি তৈরির দক্ষ মানুষ। বিশেষ করে পুটি মাছ শুকিয়ে তারা যে শীদল শুটকি তৈরি করতেন, তার সুনাম আশপাশের বহু গ্রামে ছড়িয়ে ছিল।

শীতের শেষে যখন বিলের পানি আরও কমে যেত, তখন বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি চাচিপাট বসিয়ে পুরো বিল ঘিরে মাছ ধরা হতো। মাছের এমন প্রাচুর্য ছিল যে প্রায় প্রতিটি বাড়ির উঠোনে সারি সারি বাঁশের চাটাইয়ের ওপর মাছ শুকাতে দেখা যেত। বাতাসে ভেসে বেড়াত শুকনো মাছের গন্ধ, আর উঠোনজুড়ে চলত নারীদের ব্যস্ততা।

আবার বর্ষার শুরুতে যখন নতুন পানি বিলে প্রবেশ করত, তখন মাছের পোনাও ঢুকে পড়ত। সেই সময় গ্রামীণ ভাষায় ‘পেলুইন’ নামে পরিচিত ত্রিভুজাকৃতির বিশেষ জাল দিয়ে টাকি, শোল ও গজার মাছের পোনা ধরা হতো। গ্রামের শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বড়রাও সেই মাছ ধরার আনন্দে অংশ নিত। যেন পুরো গ্রামটাই তখন এক বিশাল উৎসবের মেলায় পরিণত হতো।

আজ বহু বছর পরে ফিরে তাকিয়ে দেখি—সেই বিলগুলো আর আগের মতো নেই। মাঝিদের ভাটিয়ালি গান হারিয়ে গেছে, নৌকার সংখ্যা কমে এসেছে, মাছের প্রাচুর্যও অতীতের গল্প হয়ে গেছে। কিন্তু স্মৃতির জলরাশিতে আজও একটি ডিঙ্গি নৌকা ভেসে চলে। মাঝির বৈঠার ছন্দ, জেলেদের সংগ্রাম, হাঁসের ঝাঁক, শাপলার হাসি, মানুষের আন্তরিকতা আর বর্ষার সেই অফুরন্ত সৌন্দর্য আমার হৃদয়ের গভীরে আজও অম্লান হয়ে আছে।

এই স্মৃতিগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন দক্ষিণ বিলের জল, বোয়ালিয়া বিলের ঢেউ, কাইজলা বিলের মাছ, মাঝিদের গান এবং সেই মানুষগুলোর নির্মল ভালোবাসা আমার হৃদয়ের গভীরে চিরসবুজ হয়ে বেঁচে থাকবে। কারণ মানুষ একদিন চলে যায়, কিন্তু তার শৈশব, তার গ্রাম আর তার স্মৃতিগুলো কখনো হারিয়ে যায় না।

চলবে…

লেখক: আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ও উন্নয়ন কৌশলবিদ। প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন

সারাবাংলা/জিএস/এএসজি