Wednesday 19 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

কেন সে দেখা দিল রে!

শুভাশীষ বড়ুয়া
১৯ আগস্ট ২০২৬ ১৭:৩৭ | আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০২৬ ১৭:৪৩

গতসন্ধ্যায় নিশ্চিত হওয়া গেছে, হোস্টেলের কোনো কামরাই আর খালি নেই। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে পরবর্তী ধাপে ভর্তিচ্ছুসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীদের থাকার আবেদন জমা পড়ে গেছে। কেউ কেউ আবার কিছুটা আগে এসেই নিজেদের পূর্বনির্ধারিত সিটে এসে উঠে পড়েছে। এ কারণে হোস্টেলের অফিস কক্ষে এখন বেশ ভিড়। কেবল রেহেনুমা ম্যাডামের বিশেষ নির্দেশনায় দোতলার তিন রুমের একটি সিট খালি।

ম্যাডামের কাছে গিয়ে সেই কামরার ফাঁকা সিটটির বিষয়ে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত জানতে চায় সাহেদা।

ফাইলে চোখ বুলাতে বুলাতে রেহেনুমা জানায়, আপাতত ওই সিট খালিই থাকবে। কিছুক্ষণের নীরবতায় সাহেদা বুঝতে পারে, তাকে তার কাজের জায়গায় ফিরে যেতে হবে। নিজের অফিস কক্ষে ফিরে আসে সাহেদা। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অভিভাবককে জানায়, আপাতত কোনো সিট খালি নেই।

বিজ্ঞাপন

সাহেদা এবার খেয়াল করে দেখে, সকাল থেকে খরচের ভাউচারগুলো নির্লিপ্ততার ছায়া হয়ে পড়ে আছে তার সামনে। এই নির্লিপ্ততার মাঝে কেন জানি সে রেহেনুমা ম্যাডামের নির্লিপ্ততার মিল খুঁজে পায়। ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে কোচিং সেন্টারের সাথে লাগোয়া অনেকগুলি ছাত্রী হোস্টেলের একটিতে ম্যানাজার হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছে সাহেদা। বলতে গেলে, তার হাত ধরেই হোস্টেলটি আজ অবধি সুনামের সাথে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তার বিশ্বস্ততা আর দায়িত্বশীলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটিও তাকে আপন করে নেয়। সে নিজেও অবশ্য অন্য কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি কখনও। বিশেষ করে, রেহেনুমা, যিনি এই হোষ্টেলের মালিক, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর পেশাগত সম্পর্কের বাইরেও সাহেদার সঙ্গে তার একটি ব্যক্তিগত হৃদ্যতা গড়ে ওঠে।

কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই সিট খালি রাখার এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আগে কখনো হয়নি সে। মনে জমে ওঠা কৌতূহল সরিয়ে রেখে আবার সামনের ফাইল আর ভাউচারে মন দেয় সাহেদা।

এইচএসসি পরীক্ষা শেষে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা একে একে তাদের জন্য নির্ধারিত সিটে উঠে আসতে শুরু করেছে। বেশীরভাগ শিক্ষার্থী মফস্বলের বিধায়, তাদের সঙ্গে অভিভাবক, সাথে প্রয়োজনীয় মালামাল থাকে। অফিস কক্ষে এই সময় বেশ ভীড় লেগেই থাকে। অনেকেই বাবা-মাকে ছেড়ে, প্রথমবারের মতো পরিবারের বাইরে থাকবে, তাই বিদায় মূহুর্তে আবেগঘন পরিবেশে আদ্র হয়ে থাকে চারপাশ। এসব দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সাহেদাসহ অপরাপর সহকর্মীরা। এমন সময় ইন্টারকমে রেহেনুমা ম্যাডামের সাথে দেখা করার অনুরোধ আসে।

সাহেদার কাছে জানতে চাওয়া হয় আগাম বুকিং দেয়া শিক্ষার্থীদের ওঠার সর্বশেষ পরিসংখ্যান। নতুন মাস শুরু হচ্ছে, সবার হিসাব নতুন করে শুরু হবে। তাই কোনো সিট খালি রাখা যাবেনা। সাহেদা জানায়, বুকিং দেওয়া প্রায় সব শিক্ষার্থীই উঠে পড়েছে। কেবল দোতলার ৩ নম্বর কক্ষের দু’জন শিক্ষার্থী আগামীকাল আসবে বলে ফোনে নিশ্চিত করেছে।

এই একটি কক্ষের আপডেট জানার জন্যই মনে এক অচেনা অস্থিরতা দানা বেঁধে উঠেছে রেহেনুমার। বলা যায়, সে নিজেই এই অস্থিরতাকে ওম দিয়ে যত্ন করেছে। সাহেদা বুঝতে পারে, তার আর কিছু বলার নাই। অনুমতি নিয়ে নিজের অফিস কক্ষে ফিরে আসে সে।

সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামতে নামতে ভাবতে থাকে, এই সামান্য কথাটুকু তো ম্যাডাম ইন্টারকমেও জেনে নিতে পারত! সিঁড়ি ভাঙ্গার এই কষ্টটুকু না দিলেও চলত। তার চেনা ম্যাডামকে কিছুটা অচেনা মনে হয়। নিজে একজন নারী বলেই হয়তো অন্য এক নারীর মনের প্রকোষ্ঠে বেড়ে ওঠা অচেনা অনুভবকে সহজে আঁচ করতে পারে সাহেদা।

রেহেনুমা সাধারণত হোস্টেলে থাকা বোর্ডারদের, যাকে সে সচেতনভাবে শিক্ষার্থী পরিচয়ে ভাবইতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, তাদের সাথে যোগাযোগের সব সুতো নিজের হাতেই রাখে। এই রাখাটাকে সে তার দায়িত্বের অংশ মনে করে। তাই চাইলে সে নিজেই অনায়সে ফোন করে জেনে নিতে পারত। দু-একবার যে ইচ্ছে করেনি তা নয়, সচেতনভাবেই নিজেকে সামলে নিয়েছে সে।

রেহেনুমা তার সামনে কক্ষভিত্তিক সাজিয়ে রাখা ফাইল থেকে বিশেষ হয়ে ওঠা ফাইলটি নিজের হাতে নেয়। ফাইলের কভার পৃষ্ঠায় শিক্ষার্থীর ছবি স্ট্যাপল করা। ফাইলের ভেতরের কিছু না দেখে আনমনে কিছু একটা ভাবে সে। ছবির আদলের সাথে যেন একজনের মিল খুঁজে পায়। এবার ফাইলের ভেতরের তথ্যগুলোয় চোখ বোলায় সে। আর তখনই খুলে যায় অতি যত্নে পুষে রাখা স্মৃতির মমির দরজা! হোস্টেলের নির্ধারিত ফরমে শিক্ষার্থীর যে স্থায়ী ঠিকানা লেখা আছে, তা তার মস্তিস্কে, একিসাথে হৃদয়ের হার্ডডিক্সে অ্যান্টিভাইরাস দিয়ে সংরক্ষণ করা আছে। ঠিকানায় বর্ণিত জনপদটি তার কাছে ‘পথের পাঁচালির’ বর্ণনার মতো চিরচেনা। হাতের লেখার বিন্যাস,বর্ণের বেঁকে যাওয়া সবকিছুতেই সে আগের মতো মিল খুঁজে পায়, কিংবা হয়তো মিল খুঁজে নিতে ভালো লাগে তার।

গ্রামের প্রতিটি রাস্তা, পুকুরপাড়, পোস্ট অফিসের দূরত্ব, গ্রামকে ছুঁয়ে থাকা নীলাভ দিগন্ত। সেই সুনীল আকাশে তার মন পাখির ডানায় ভর করে ঘুরে বেড়ায়। সবই যেন তার নিজের মতো করে স্কেচ করা। অথচ তার যাওয়া হয়নি কোন কালে। কেবল হলুদ খামের ভেতর এলোমেলো হাতের লেখা হয়ে তার অনুভূতির দূত হয়ে পৌঁছে গেছে। কিন্তু সেই অনুভূতি ছিল কেবল একমুখী যাত্রা হয়ে থেকে গেছে চিরকাল। তা আকাশের গন্ধ মেখে চিলের ডানায় ভর করে ফিরে আসেনি. কিংবা ফিরে আসার কোনো পথ জানা ছিল না তার। তবু সেই হলুদ খাম ঢাকা শহরের অগুন্তি কিশোরীর একজন হয়ে, তার সকল ভালোলাগা, যত্নে পুষে রাখা কষ্ট, শেষ বিকালের স্নিগ্ধ অনুভূতি হয়ে পৌঁছে যেত সেই মেঠো পথ ধরে।

চট্টগ্রাম শহর থেকে সাত সিটের নোহা গাড়ি নিয়ে নিলান্তি ও অবন্তি, দুই বন্ধু সাথে মায়েরা ভোর তিনটায় ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। সকাল নয়টার মধ্যেই তারা ফার্মগেটের পূর্বনির্ধারিত হোষ্টেলের সামনে এসে দাঁড়ায়। হোষ্টেলের ফটকে চিরচেনা ব্যস্ততা। সাহেদা তার কাজের মধ্যে থেকেও কিভাবে জানি বুঝতে পারে, নতুন কোন আগন্তুক এসে পড়েছে। লিখতে থাকা কলম থামিয়ে সামনে চোখ মেলে তাকায় সে।

নিলান্তির মায়ের চোখে চোখ পড়তেই সাহেদা পরিচিত ঢঙে কুশল বিনিময় করে। এই পরিচিতি কোন সুতোয় বাঁধা, সাহেদা নিজেই বুঝতে পারেনা! সাহেদার পেশাদারিত্বের বাইরে গিয়ে এই শুভেচ্ছা বিনিময় নিলান্তির মায়ের ভ্রমণক্লান্তি কিছুটা কমিয়ে দেয়। সাহেদার চোখের ইশারায় দুজন নারী কর্মী এসে নতুন বোর্ডারদের আর তাদের সাথে ভারী ব্যাগগুলো তাদের জন্য নির্ধারীত কামরায় নিয়ে যায়। দুই বান্ধবীর মায়েরা ডেস্কে কিছু প্রশাসনিক তথ্য পূরণ করে সাহেদার বলে দেয়া পথ ধরে মেয়ের কামরার দিকে এগিয়ে যায়। নীচ তলার সিঁড়ি শেষ করে দোতলায় উঠতে গিয়ে বারান্দায় চোখে পড়ে বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ ব্যস্ততা। আগন্তুকদের প্রতি কৌতুহল কিংবা অবহেলা মিশেলে চাহনি !

১৫ বাই ১২ ফুটের একটি কক্ষ, সঙ্গে লাগোয়া ওয়াশরুম। তিনটি চৌকি, টেবিল এবং দেয়ালে বিশেষ কায়দায় লাগানো আলমিরা। দুজন থাকার জন্য ভালো, কিন্তু তিনজন হলে কিছুটা অস্বস্তিকর। জানা যায়, কোনো কোনো রুমে চারজনও থাকে। তবে এক্ষেত্রে ভাড়া কিছুটা কম। নিলান্তি আর অবন্তি ভ্রমন ক্লান্তিতে হাত-পা ছেড়ে বসে আছে। মায়েদের তো ক্লান্তি থাকতে নেই! তাই তারা সাথে আনা ব্যাগ খুলে যতটা সম্ভব গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মোটামুটি গোছগাছ শেষ করে তারাও বিছানায় বসে পড়ে। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ায় সাহেদা।

‘এই রুমে তিনটি সিট দেখতেই পাচ্ছেন, কিন্তু আমাদের মালিক, মানে ম্যাডাম জানিয়েছেন, এই রুমে আর কাউকে তোলা হবেনা। ওরা যে কদিন থাকবে, একটা সিট খালিই থাকবে।’ একথা বলে কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ব্যস্ততা দেখিয়ে উঠে চলে যায় সাহেদা।

সাহেদা চলে যাওয়ার পর চারজনের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা ভর করে। হয়ত চারজনের মধ্যে একই অজানা কারণ ভর করেছে বলেই এই ঐকতান! তিনজনের রুমে দুজন থাকবে, এই সুবিধার কথা ভাবতেই সকলের ভ্রমন ক্লান্তি একেবারেই উবে যায়! রুমের সাথে লাগোয়া ওয়াশ রুমে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে চারজনই বেশ চনমনে। এরপর কিছু প্রয়োজনীয় কেনাকাটা ও পূর্বনির্ধারিত কোচিং সেন্টার দেখতে তারা একসাথে বেরিয়ে পড়ে। কেনাকাটা শেষে একসাথে দুপুরের খাবার সেরে মেয়েদের হোস্টেলে ফিরে আসে।

নিলান্তি, অবন্তি আর তাদের মায়েদের উপস্থিতি সাহেদার আয়েশি অলসতায় ছেদ ঘটায়। বিদায়ের ক্ষণ দিনের আলোকে কিছুটা হলেও আদ্র করে তুলল। মেয়েরা নিজেদের মত করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে, সিঁড়ির বাঁকে দুজনেই থেমে পিছু ফিরে তাকায়। ছলছল চোখে মায়েদের সাথে ভালো থাকার কিংবা ভালো রাখার নীরব প্রতিশ্রুতি বিনিময়।

শুক্রবার কোচিং বন্ধ। অবন্তি তার কিছু কেনাকাটা করার জন্য নিচে গেছে। নিলান্তি পড়ার টেবিলে অনলাইনে মক টেস্ট দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় রেহেনুমা দরজায় টোকা দেয়।

নিলান্তি উঠে এসে দরজা খুলে দেখে অপরিচিত একজন নারী দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। বিহ্বলতা কাটিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবে, তার আগেই রেহেনুমা নিজেই বলে উঠলেন, ‘আমি এই হোস্টেলের পরিচালক। তোমাদের সাথে আলাপ করতে আসলাম। কোচিং থেকে তোমাদের সাপ্তাহিক পরীক্ষার রেজাল্ট আমার কাছে আসে। দেখলাম তোমরা দুজনেই বেশ ভালো করে যাচ্ছ। এটি আমাদের হোস্টেলের রেপুটেশানের সাথে জড়িয়ে যায়।’

এতক্ষণ নিলান্তি কোনও কথা বলে না। রেহেনুমা বলেই যায়, ‘তোমার নাম নিলান্তি? ভেতরে আসার অনুমতি পাব?’

নিলান্তি মাথা নাড়ে। সাথে অস্পষ্ট স্বরে হ্যাঁ বলে। রেহেনুমা অতকিছু খেয়াল না করে রুমের চারপাশ চোখ মেলে তাকায়। রুমের কিছুটা অগোছালো ভাব তার চোখেমুখে কিছুটা রেখাপাত করল।

রেহেনুমা: তোমার বন্ধু কোথায় ?

নিলান্তি: বিকাশে টাকা ক্যাশ আউট করবে, কিছু কেনাকাটা আছে। তাই বাইরে গেছে।

রেহেনুমা নিলান্তির হাতে একটি বক্স রেখে বলে, ‘এটা রাখো। তোমাদের দুজনের জন্য। ভালো রেজাল্টের শুভেচ্ছা বলতে পারো।’ পরিবারে আর কে কে আছে, মা-বাবার পেশা জানা থাকা সত্ত্বেও আবার জেনে নিয়ে একটি গোপন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে রেহেনুমা। আবার দেখা হবে বলে উঠে পড়ে।

‘আবার আসবেন, ম্যাডাম’ বলে উঠে দাঁড়ায় নিলান্তি। রেহেনুমা ফিরে দাঁড়িয়ে বলে, ‘তুমি আমাকে আন্টি বলে ডেকো’। বলে বেরিয়ে পড়ে সে।

অবন্তি রুমে ঢুকেই নিলান্তির হাতে ধরে থাকা চকলেটের বক্স দেখে। চকচকে বক্সটি দেখে হুরমুর করে তার পাশে এসে বসে দারুণ কৌতূহলী হয়ে পড়ে অবন্তি।

নিলান্তি: একটু আগে হোস্টেলের পরিচালক আন্টি এসে দিয়ে গেলেন। কোচিংয়ের রেজাল্ট ভালো হয়েছে বলে শুভেচ্ছা দিলেন।

চারপাশে অদৃশ্য প্রাচীর ঘেরা জগতে বাস করা মানুষটি নিজে এসে চকলেট দিয়ে গেল! অবন্তির চোখে রাজ্যের কৌতূহল। কোনো কূলকিনারা না পেয়ে দুজনেই চকলেট ভাগাভাগিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কোচিংয়ের ব্যস্ততা ক্রমশ বেড়ে চলছে। সাপ্তাহিক পরীক্ষার বদলে দুদিন পরপরই পরীক্ষা চলছে। এর মাঝে জানা যায়, এইসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট বেরুবার দিনক্ষণ। নির্ভারতার মাঝেও কিছুটা অনিশ্চয়তা মনে বাসা বেঁধে থাকে। পরীক্ষার্থী হিসাবে সেই অনিশ্চয়তাকে লালন করেই প্রত্যাশিত কিছুর স্বপ্ন বুনে যায় নিলান্তি আর অবন্তি।

রেজাল্ট বেরুলে দেখা যায় , দুজনেই প্রত্যাশিত রেজাল্ট পেয়ে বেশ খুশি। আশপাশের চিরচেনা নীরবতা ভেঙে আজ কিছুটা কোলাহল। কাঙ্ক্ষিত ফলের বার্তা চারদিক ছড়িয়ে দিচ্ছে। আপাত লক্ষ্য অর্জনের পর এবার ভর্তিযুদ্ধের ভাবনা। সেই ভাবনার চাদরে মুড়ে হোস্টেলে আবারও চিরচেনা নীরবতা নেমে আসে। জীবনের এই ‘সাইকেলে’ আমরা সবাই সহযাত্রী। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা এবার বিভাগীয় শহরগুলোতে হবে। জানা যায়, সবার আগে হবে বিইউপির ভর্তি পরীক্ষা। নিলান্তি আর অবন্তি বিভাগীয় শহরের বাসিন্দা, তাই তাদের ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ন হওয়ার পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের শহরে বসেই ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে তারা। পরিবারের সম্মতি পেয়ে দুজনে মিলে রেহেনুমা’র কক্ষে যায়। অনুমতি পেয়ে সুনসান নীরবতায় ডুবে থাকা রেহেনুমাকে কিছুটা অচেনা লাগে। রেহেনুমা নিজেই কথা শুরু করে।

রেহেনুমা: শুনলাম তোমাদের এইস এস সি রেজাল্ট বেশ ভাল হয়েছে। এবার কি ভাবছ?

নিলান্তি: এই বিষয়ে আলাপের জন্যই আপনার কাছে আসা।

অবন্তি: এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা বিভাগীয় শহরে হবে, তাই আমরা আমাদের নিজ শহরে বসে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেব ভেবেছি।

রেহেনুমা: এ তো বেশ স্বস্তির খবর। তার মানে তোমরা সহসাই নিজ শহরে ফিরে যাচ্ছ। কিন্তু তোমরা এই দূর শহরে নিজের জায়গা খুঁজে নেবে বলেই তো এসেছিলে।

অবন্তি: কোচিংয়ের সিলেবাস শেষ, এখন শুধু পরীক্ষা চলছে। আমরা ভাবছি পরীক্ষাগুলো বাড়ি ফিরে গিয়েই দেব।

নিলান্তি: বাংলা আর সাধারণ জ্ঞানের বিশেষ প্রস্তুতি বাড়িতে ফিরে গিয়ে নেব ভেবেছি।

রেহেনুমা: তোমরা কবে যাচ্ছ ?

অবন্তি : বাবা বলেছে, সামনের শনিবার নিতে আসবে।

রেহেনুমা: মানে সামনের মাসের এক তারিখ?

এমনভাবে বলে, এক তারিখ বুঝি সামনে থাকা আরো ছয়টি দিন ডিঙিয়ে এখন এসে বলছে, আজ এক তারিখ!

টেবিলের দুই প্রান্তে বসা মানুষগুলোর মাঝখানে নীরবতা যেন দেয়াল হয়ে আছে। নিলান্তি আর অবন্তি এই হঠাত আবির্ভূত এই দেয়ালের অস্তিত্ব টের পেলেও এর কোনো কারণ খুঁজে পেল না। রেহেনুমা নিজের চেয়ার থেকে উঠে এসে দুজনের চোখে চোখ রেখে বলে, ‘তোমাদের জন্য আগাম শুভকামনা।’

নীরবতার মাঝে অচেনা বিহ্বলতা ! দুই বান্ধবী নিজেদের মধ্যে কোনো কথা না বলে সেই নিস্তব্ধতাকে সঙ্গী করেই রুমে ফিরে আসে। সময় তার আপন নিয়মে সপ্তাহের দিনগুলোকে একটি একটি করে কাছে ডেকে আনে। নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখে নিলান্তি আর অবন্তি। কারণ, আটচল্লিশ ঘন্টা পেরুলেই শনিবার দরজায় কড়া নাড়বে। এর মধ্যে হোস্টেল ছাড়ার প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতাও তারা শেষ করে রাখল।

হোস্টেলের সামনে কুচকুচে সাপের বিষের মত কালো রঙের নোহা গাড়ি রাত জাগা ভ্রমনের ক্লান্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে ঝিমুনি দেয়া মানুষের মত লাগে। কিন্তু তার গায়ের রঙের গভীরতায় তার আভিজাত্য চোখে পরে বেশি। সারাদিন এখানে কত গাড়িই তো এসে থামে। কিন্তু আজ এই গাড়িটি যে দূর থেকে দাঁড়িয়ে কারো অপলক চাহনির কারণ হতে পারে, অক্ষি কোণে স্ফটিকের মত স্বচ্ছ জলধারা গোপন বাঁধ ভেঙে অকাল রোদন ঘটাবে, তা কি সে জানে? এ কেবল একান্ত নিজের গোপন দুঃখী খরস্রোতা নদী হয়ে বয়ে যায়। একসময় গাড়িটি তার ঝিমুনি কাটিয়ে নড়েচড়ে উঠে। পাশের বাড়ির চিলেকোঠা থেকে ইথারে ভেসে আসে……..

সে কেনো দেখা দিল রে
না দেখা ছিলো যে ভালো
সে কেনো দেখা দিল রে
না দেখা ছিল যে ভালো
বিজলির মত এসে সে
কোথা কোন মেঘে লুকালো
না দেখা ছিল যে ভালো।

লেখক: উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, সদর, খাগড়াছড়ি

সারাবাংলা/এনজে/এএসজি