Thursday 20 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

বাজার সংকটে থমকে আছে সম্ভাবনাময় শৈবাল-ঝিনুক চাষ

ইমরান হোসাইন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১০ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০৬ | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১২:১০

সামুদ্রিক শৈবাল (সি-উইড) ও গ্রিন মাসেল (সবুজ ঝিনুক) চাষ। ছবি: সারাবাংলা

কক্সবাজার: শহরের কোলাহল ছেড়ে মাত্র চার কিলোমিটার এগোলেই খুরুশকুল-মহেশখালী চ্যানেল উপকূল। যেন চোখের সামনে অন্য এক পৃথিবী। জোয়ার-ভাটার ওঠানামা, লোনা বাতাস, আর বিস্তীর্ণ জলরাশি। প্রকৃতি যেন এখানে নিজেই আঁকছে সম্ভাবনার নকশা।

এই উপকূলেই গড়ে উঠতে পারতো সামুদ্রিক শৈবাল (সি-উইড) ও গ্রিন মাসেল (সবুজ ঝিনুক) চাষভিত্তিক নতুন অর্থনীতি। যা বদলে দিতে পারত হাজারো মানুষের জীবন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সম্ভাবনার এই আলো এখনো পুরোপুরি ছড়াতে পারেনি। বাজার সংকট, পরিকল্পনার অভাব আর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় থমকে আছে এই খাত।

স্বপ্ন, ঝুঁকি আর এক উদ্যোক্তার গল্প

এই সম্ভাবনার গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন স্থানীয় উদ্যোক্তা আনোয়ার মিয়া। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ২০১৮ সালে তিনি নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে ঝুঁকির পথে হাঁটেন।

বিজ্ঞাপন

শুরুতে ছিল মাত্র কয়েকটি ভেলা। তাতে শৈবাল চাষ। তারপর ধীরে ধীরে যুক্ত হয় সবুজ ঝিনুক ও কোরাল মাছ। একসময় তিনি একই ভেলায় তিন ধরনের উৎপাদনের সমন্বিত মডেল দাঁড় করান। যা দেশের জন্য নতুন এক দৃষ্টান্ত।

সামুদ্রিক শৈবাল চাষ। ছবি: সারাবাংলা

সামুদ্রিক শৈবাল চাষ। ছবি: সারাবাংলা

জোয়ার-ভাটার ছন্দে গড়ে ওঠা এই চাষ পদ্ধতি এখন ভালো ফলন দিচ্ছে। খরচ কম, পরিবেশবান্ধব, রোগবালাইও তুলনামূলক কম। কিন্তু সমস্যা একটাই- বাজার।

আনোয়ার মিয়ার কণ্ঠে হতাশা, ‘উৎপাদন হচ্ছে, কিন্তু বিক্রি করতে পারি না। অনেক সময় শৈবাল আর ঝিনুক নষ্ট হয়ে যায়। এতে বড় লোকসান হয়।’

সম্ভাবনার ভাণ্ডার, কিন্তু নেই বাজার

বিশ্বজুড়ে শৈবাল এখন ‘সুপারফুড’ হিসেবে পরিচিত। খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, এমনকি টেক্সটাইল ও বায়োটেক শিল্পেও এর ব্যবহার বাড়ছে। সবুজ ঝিনুক উচ্চ পুষ্টিগুণের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাসম্পন্ন।

কিন্তু খুরুশকুলের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নেই স্থায়ী ক্রেতা, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, সংরক্ষণাগার ও রফতানি চেইন। ফলে উৎপাদিত পণ্যের বড় অংশই অবিক্রিত থেকে যায়। সময়মতো বিক্রি না হওয়ায় পঁচে যায় শৈবাল ও ঝিনুক। উদ্যোক্তাদের ভাষায়,‘উৎপাদনের চেয়ে বড় সমস্যা এখন বিক্রি।’

নারীনির্ভর এক নতুন অর্থনীতি

এই খাতের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় প্রায় এক হাজার চাষি শৈবাল উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। যাদের বড় অংশই নারী। নুনিয়াছড়া, রেজুখাল, সোনাদিয়া, শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত নারী এখন শৈবাল চাষ করছেন। মরিয়ম, আনোয়ারা, মমতাজদের মতো নারীরা পরিবারে নতুন আয়ের উৎস তৈরি করেছেন।

শৈবাল চাষি মরিয়ম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগে সংসারে টানাটানি ছিল। আয় হচ্ছে। কিন্তু, দাম না পাওয়ায় লাভ কমে যাচ্ছে।’

সামুদ্রিক ঝিনুক চাষ। ছবি: সারাবাংলা

সামুদ্রিক ঝিনুক চাষ। ছবি: সারাবাংলা

কীভাবে হয় এই চাষ

শৈবাল চাষ প্রধানত দুই পদ্ধতিতে হয়। লং লাইন পদ্ধতি; দড়িতে নির্দিষ্ট দূরত্বে চারা বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে রাখা। আর ভাসমান ভেলা পদ্ধতি; বাঁশ বা পাইপের ভেলায় দড়ি ঝুলিয়ে চাষ। নভেম্বর থেকে এপ্রিল এই চাষ করা হয়। চাষের ১৫-২১ দিনের মধ্যেই প্রথম ফসল পাওয়া যায়। প্রায় নয় কেজি ভেজা শৈবাল শুকিয়ে এক কেজি হয়।

বাজারে তাজা শৈবালের কেজিপ্রতি দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। আর শুকনা শৈবাল বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ১০০০ টাকা দরে। তবে মৌসুমে ফলন বেশি হলে দাম পড়ে যায়, যা চাষিদের বড় ক্ষতির কারণ।

গবেষণা, প্রকল্প আর সীমাবদ্ধতা

২০১৬ সাল থেকে শৈবাল চাষ নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। এতে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা। প্রশিক্ষণ, চারা ও উপকরণ সরবরাহ করা হলেও বড় সমস্যা রয়ে গেছে ধারাবাহিকতা ও বাজার সংযোগের অভাব।

কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আকতারুজ্জামানের মতে, বীজ উৎপাদনেও ঘাটতি রয়েছে। পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, এ খাতের বিশ্ববাজারে বিশাল সুযোগ। বিশ্বে শৈবালের বাজার এখন বিলিয়ন ডলারের। চীন, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এই খাতে এগিয়ে।

জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, বছরে ৩৬ মিলিয়ন টনের বেশি শৈবাল উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের রয়েছে ৭১০ কিলোমিটার উপকূলরেখা ও প্রায় ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা। সঠিক পরিকল্পনায় বছরে ২০-৩০ হাজার কোটি টাকার শৈবাল ও ঝিনুক রফতানি সম্ভব।

সামুদ্রিক শৈবাল চাষ। ছবি: সারাবাংলা

সামুদ্রিক শৈবাল চাষ। ছবি: সারাবাংলা

উদ্যোক্তা মারিয়ার ভিন্ন পথচলা

কক্সবাজারের উদ্যোক্তা মারিয়া রে শৈবালকে নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়। তিনি শৈবাল দিয়ে তৈরি করছেন, সাবান, গুঁড়া, স্যুপ ও বিভিন্ন খাবার। ২০২৫ সালে প্রায় দুই লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন তিনি। বর্তমানে দেড় একর জমিতে চাষ করছেন এবং ৩০ লাখ টাকা বিক্রির লক্ষ্য নিয়েছেন। তার খামারে কাজ করছেন স্থানীয় নারীরা। যা এই খাতকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করছে।

পরিবেশ ও জলবায়ুর দ্বৈত উপকার

বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাইন্টিফিক অফিসার মীর কাশেম সারাবাংলাকে বললেন, “শৈবাল শুধু অর্থনৈতিক নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি কেজি শৈবাল প্রায় ০.৭ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, সমুদ্রের পানি পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে এবং জলজ প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে। অর্থাৎ এটি ‘ব্লু কার্বন’ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”

এখন যা দরকার

বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের মতে, খাতটিকে এগিয়ে নিতে জরুরি হলো প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, কোল্ড স্টোরেজ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সহজ শর্তে ঋণ, রপ্তানি বাজার তৈরি, স্থানীয় বাজারে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গভীর সমুদ্রে বছরব্যাপী চাষের উদ্যোগ।

সম্ভাবনা বনাম বাস্তবতা

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বললেন, ‘খুরুশকুলের উপকূলে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে দুটি দৃশ্য দেখা যায়। একদিকে সম্ভাবনার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে বাস্তবতার কঠিন সীমাবদ্ধতা। আনোয়ার মিয়া, মরিয়ম বা মারিয়ার মতো উদ্যোক্তারা প্রতিদিন জোয়ার-ভাটার সঙ্গে লড়াই করে স্বপ্ন বুনছেন।’

তার দাবি, উদ্যোক্তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দরকার নীতিগত সহায়তা, পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও নিশ্চিত বাজার। তাতেই খুরুশকুলের এই উপকূল একদিন হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির শক্তিশালী প্রাণকেন্দ্র। যেখানে সমুদ্রই হবে জীবিকার সবচেয়ে বড় ভরসা।

সারাবাংলা/পিটিএম