Saturday 15 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

অর্ধেকেরও বেশি পশু বিক্রি শেষ, শঙ্কা জাগাচ্ছে সীমান্ত!

মো. আশরাফুল ইসলাম, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৮ মে ২০২৬ ০৮:১০ | আপডেট: ১৮ মে ২০২৬ ১০:৫২

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়নের একটি অ্যাগ্রো খামার। ছবি: সংগৃহীত

চাঁপাইনবাবগঞ্জ: পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে পশুপালনে ব্যাপক সাড়া জেগেছে উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে। আমের জন্য বিখ্যাত বরেন্দ্রভূমির এই জেলাটি এখন পশুপালনেও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ দফতরের তথ্যানুযায়ী, এবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি কোরবানির পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সাম্প্রতিক তীব্র লোডশেডিংয়ে খামারিরা কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়লেও শেষমেশ ভালো দামে পশু বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা তাদের। এরই মধ্যে অনেক খামারি তাদের অর্ধেকেরও বেশি পশু বিক্রি করে ফেলেছেন। তবে বর্তমানে খামারিদের চিন্তা জাগাচ্ছে, সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় পশু প্রবেশ। যদি ভারতীয় পশু প্রবেশে অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে চরম ক্ষতির মুখে পড়বে খমারিরা।

বিজ্ঞাপন

জেলায় এবার ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৪ হাজার খামারে কোরবানির পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। বাণিজ্যিক খামারের পাশাপাশি অনেক সাধারণ মানুষও তাদের নিজেদের বাড়িতে ছোট শেড বা টিনের চালা তৈরি করে দুই-চারটি করে গরু-ছাগল মোটাতাজা করছেন। ঈদের আর অল্প কিছুদিন বাকি থাকায় খামারি ও খামার শ্রমিকদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। সময় মতো খাবার দেওয়া, গোসল করানো ও সার্বিক যত্ন-আত্তির যেন কোনো কমতি না হয়, সেদিকে দিন-রাত নজর রাখছেন তারা।

খামারিদের মতে, শেষ সময়ের পরিচর্যায় একটু ভাটা পড়লেই কোরবানির পশুর কাঙ্ক্ষিত দাম মিলবে না। খামারের শ্রমিকরাও এখন নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন পশুর পেছনে। তাদের আশা, মালিক পক্ষ লাভবান হলে তাদের কর্মসংস্থান ও বোনাস সুনিশ্চিত হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়নে অবস্থিত দেশের অন্যতম মাল্টিপল কৃষি খামার ‘হাসানুল অ্যাগ্রো’। দীর্ঘ ২০ বছরের এই খামারে এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে শত শত হৃষ্টপুষ্ট গরু। খামারের মালিক হাসানুল বান্না সারাবাংলাকে বলেন, ‘এরই মধ্যে খামারের প্রায় ৭০ শতাংশ গরু ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়গঞ্জের বাজারে বিক্রি হয়ে গেছে। আমাদের সংগ্রহে ৭০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩ লাখ টাকা মূল্যের গরু আছে।’

তবে অনেক বড় খামারি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, বর্তমান তেল সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক দূরপাল্লার ব্যবসায়ী এবার সরাসরি গ্রামাঞ্চল থেকে এসে গরু সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে স্থানীয় বা দূরবর্তী বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা কিছুটা ব্যাহত হতে পারে এবং দাম কিছুটা বাড়তে পারে।

খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ভুট্টা, গম, ভুসি ও খৈলসহ সবধরনের গো-খাদ্যের দাম আকাশচুম্বী। এর ওপর ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিং তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, তীব্র গরমে পশুর সঠিক বৃদ্ধি ও সুস্থতার জন্য নিয়মিত পানি ও বাতাস (ফ্যান) নিশ্চিত করা জরুরি।

তবে এই মুহূর্তে খামারিদের সবচেয়ে বড় শঙ্কা সীমান্ত নিয়ে। তাদের একাংশ জানান, সারা বছর কষ্ট করে কোরবানি নিয়ে তাদের বড় আশা থাকে। যদি এই শেষ সময়ে এসে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ করে এবং সেগুলোকে কোনোভাবে ছাড়পত্র দেওয়া হয়, তবে দেশীয় প্রান্তিক খামারিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ কঠোরভাবে বন্ধ থাকলে এবার ভালো লাভ করা সম্ভব।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা প্রায় দুই লাখ ২৬ হাজার ৫০০টি। যেখানে জেলায় স্থানীয় পশুর চাহিদা রয়েছে মাত্র একলাখ ৬৭ হাজার ২০২টি। ফলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও জেলায় প্রায় ৫৯ হাজার ২৯৮টি (প্রায় ৬০ হাজার) গবাদিপশু উদ্বৃত্ত থাকছে, যা দেশের অন্যান্য পশুরহাটে সরবরাহ করা হবে।

নিরাপদ মাংস উৎপাদনের বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোসা. শারমিন আক্তার (বিসিএস লাইভস্টক) সারাবাংলাকে বলেন, ‘কোনো ধরনের কেমিক্যাল, স্টেরয়েড ড্রাগ বা ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার না করে খামারিরা যাতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও ন্যাচারাল খাবারে পশু মোটাতাজা করেন, সে বিষয়ে আমরা সবসময় তাদের উদ্বুদ্ধ করছি। নিরাপদ মাংসের বাজার নিশ্চিতে আমাদের টিম সার্বক্ষণিক মাঠে থেকে খামারিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে।

প্রান্তিক খামারি ও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, যদি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সীমান্ত দিয়ে অবৈধ গবাদিপশুর প্রবেশ কঠোরভাবে বন্ধ রাখা যায় এবং সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়, তবে গো-খাদ্যের ঊর্ধ্বমূল্য আর নানা প্রতিকূলতা ছাপিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের খামারিরা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং অতীতের লোকসান কাটিয়ে লাভের মুখ দেখবেন।

সারাবাংলা/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর