Thursday 20 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

বৃষ্টি হলেই হাঁটু পানি, দুর্ভোগে ঘিওর বাজারের ব্যবসায়ী-ক্রেতারা

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৭ জুন ২০২৬ ১২:৪৫

বৃষ্টি হলেই কাদা পানি।

মানিকগঞ্জ: একটু বৃষ্টি হলেই হাঁটুসমান পানিতে ডুবে যায় মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ঘিওর বাজারের বিভিন্ন অংশ। জলাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ভাঙাচোরা সড়ক এবং ময়লা-আবর্জনার কারণে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন হাজারো ব্যবসায়ী ও ক্রেতা। জেলার অন্যতম বৃহৎ এই বাজারে প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার লেনদেন হলেও দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে ব্যাবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়ছে।

ইছামতী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ঘিওর বাজার ও সাপ্তাহিক হাট জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বাজারে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১২০০টি ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতি বুধবার বসা হাটে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার ক্রেতা ও বিক্রেতার সমাগম ঘটে।

বিজ্ঞাপন

তবে সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে বাজারের ধানহাট, কাঠপট্টি, মাছবাজার, গুড়পট্টি ও সবজিবাজারের বিভিন্ন অংশ হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে যায়। এতে স্বাভাবিক বেচাকেনা ব্যাহত হয়। পানি নেমে যাওয়ার পরও দুর্ভোগ কমে না। জমে থাকা কাদা ও ময়লা থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাজারে।

মাছবাজারের ব্যবসায়ী মিঠু রাজবংশী বলেন, ‘একটু বৃষ্টি হলেই মাছবাজারে পানি জমে যায়। ড্রেনে ময়লা জমে আছে। প্রচুর দুর্গন্ধ আর কাদা-পানি মাড়িয়ে ক্রেতারা আসতে চান না। এতে আমাদের বিক্রি কমে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই সমস্যার কোনো সমাধান হচ্ছে না।’

কাঠপট্টির ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বাজার হওয়ার পর থেকেই একই অবস্থা। কোনো উন্নতি নাই। বৃষ্টির দিনে এই পট্টি দিয়ে হাঁটাচলাই কষ্টকর, সেখানে মালামাল নেওয়া তো আরও কঠিন। রাস্তাঘাট এতটাই ভাঙাচোরা যে মালামাল আনা-নেওয়ায় বাড়তি খরচ হয়। জলাবদ্ধতার কারণে বড় বড় কাঠ ও আসবাবপত্র দোকান থেকে ওঠানামা করাতেও বেশ কষ্টকর আর সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।’

আরেক ব্যবসায়ী মো. রফিকুল বলেন, ‘আমার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান কাঠপট্টিতে। এখানে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন কাঠ ব্যবসায়ী আছেন। বৃষ্টির দিনে তাদের সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হয়। বেচাকেনা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। বৃষ্টির পর এমন পরিবেশ তৈরি হয় যে ক্রেতারা আর আসতে চান না।’

ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন বলেন, ‘অন্যান্য দিনের তুলনায় হাটের দিন কয়েকগুণ বেচাকেনা হয়। আমরা হাটে ইজারা দিই। আর হাটের আগে যদি বৃষ্টি হয় তাহলে সেদিন আমাদের বড় রকমের লোকসান হয়। কারণ অধিকাংশ ক্রেতা জানেন বৃষ্টির পরে এই হাটে যাতায়াত করা অনেক কষ্টকর। বর্তমানে বাজারের অবস্থা দেখলে মনে হয় কোনো কর্তৃপক্ষের নজর নেই। বৃষ্টির সময় হাটে ব্যাবসা করার কোনো পরিবেশ থাকে না।’

সবজি বাজারের ব্যবসায়ী রাকিব বলেন, ‘নোংরা পানি জমে থাকার কারণে বাজারে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে ক্রেতারা দ্রুত বাজার ছেড়ে চলে যান। বাজার থেকে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীদের জন্য ন্যূনতম সুবিধাও নিশ্চিত করা হয়নি। দ্রুত কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’

শুধু ব্যবসায়ীরাই নন, দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারাও। বাজারে কেনাকাটা করতে আসা শহিদুল আলম বলেন, ‘বৃষ্টির দিনে বাজারে প্রবেশ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। হাঁটু পানি মাড়িয়ে বাজার করতে হয়। পরিবার নিয়ে আসা সম্ভব হয় না। এই বাজারের পরিবেশ ভালো করা প্রয়োজন। পুরুষ মানুষের যেখানে চলাচল কষ্টকর হয়ে গেছে সেখানে নারীদের কথা চিন্তা করেন একবার। আমরা চাই বাজারটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হোক।’

রেহানা বেগম বলেন, ‘ময়লা পানির গন্ধে বাজারে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। আমার স্বামী বিদেশে থাকেন। আমাকেই প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই করতে হয়। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য পরিস্থিতি খুবই অস্বস্তিকর। এত বড় একটি বাজারের এই অবস্থা দুঃখজনক।’

ঘিওর বাজার ব্যবসায়ী ব্যবস্থাপনা পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ লতা বলেন, ‘ঘিওর বাজার জেলার অন্যতম বড় বাজার। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কেনা-বেচা হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সেই তুলনায় কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। জলাবদ্ধতা ও ভাঙাচোরা সড়কের কারণে ব্যাবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতি বুধবার হাটে হাজার হাজার মানুষ আসেন। অথচ মৌলিক অবকাঠামোর অভাবে সবাইকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত বাজারের সমস্যা সমাধান করা হোক।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার বছর আগে বেপারীপাড়া এলাকায় প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি সরু ড্রেন নির্মাণ করা হয়। তবে ড্রেনটির কোনো ঢাকনা না থাকায় এটি পানি নিষ্কাশনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং এটি এখন পথচারীদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্ধকারে অনেকেই ড্রেনে পড়ে আহত হন। এছাড়া ড্রেনে জমে থাকা পানিতে মশার বংশবিস্তারও বাড়ছে।

এ বিষয়ে ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাশিতা-তুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঘিওর বাজারের সমস্যা সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। বাজারের ড্রেনেজ ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে গরু হাট থেকে মাছবাজার পর্যন্ত আরসিসি সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও উন্নয়নকাজ করা হবে।’

 

সারাবাংলা/এএ