Saturday 15 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মিলছে না সরকারি দর, লোকসানে গাইবান্ধার চামড়া ব্যবসায়ীরা

তাসলিমুল হাসান সিয়াম, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৮ জুন ২০২৬ ০৮:০৯ | আপডেট: ৮ জুন ২০২৬ ১০:০২

গাইবান্ধার হাটে চামড়া কেনাবেচা চলছে। ছবি: সারাবাংলা।

গাইবান্ধা: কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সরকার এ বছর লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার দাম বাড়ালেও গাইবান্ধার বাজারে মিলছে না সেই মূল্য। সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ। এতে একদিকে ব্যবসায়ীরা গুনছেন লোকসান, অন্যদিকে বঞ্চিত হচ্ছে এতিম ও অসহায়দের প্রাপ্য অর্থ।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেট এবং ট্যানারিগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণেই চামড়ার ন্যায্যমূল্য মিলছে না। যদিও স্থানীয় আড়তদাররা বলছেন, প্রকৃত কারসাজি হচ্ছে ঢাকার ট্যানারি পর্যায়ে।

বিজ্ঞাপন

গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুর রাজ্জাক জানান, জেলায় এ বছর মোট ১ লাখ ৫১৪টি পশু কোরবানি হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১১ হাজার বেশি।

জানা গেছে, এ বছর সরকার ঢাকার বাইরে গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। সেই হিসাবে মাঝারি আকারের একটি গরুর চামড়ার দাম হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকা। কিন্তু বাস্তবে গাইবান্ধার বিভিন্ন হাটে চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়। ছোট চামড়া বিক্রি হয়েছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়, আর বড় চামড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়।

মাঠ পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি মূল্য বাস্তবায়নে কার্যকর তদারকির অভাব রয়েছে। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীরা নানা অজুহাতে কম দামে চামড়া কিনে নিচ্ছেন। পচনশীল পণ্য হওয়ায় বিক্রেতারাও বাধ্য হয়ে লোকসানে বিক্রি করছেন।

গাইবান্ধার সবচেয়ে বড় পাইকারি চামড়ার বাজার পলাশবাড়ী উপজেলার কালিবাড়ি হাটে গিয়ে দেখা যায়, কোরবানির ঈদের পরও বেচাকেনা চলছে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় আমদানি কম বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

চামড়া ব্যবসায়ী গোলাপ চাঁন বলেন, ‘ধারদেনা করে সরকার নির্ধারিত দামে ৭০০ পিস চামড়া কিনেছিলেন তিনি। কিন্তু হাটে চামড়া কিনছেন মূল ক্রেতাদের প্রতিনিধিরা। তারা যে দাম দিচ্ছেন, তাতে প্রতিটি চামড়ায় প্রায় ২০০ টাকা লোকসান হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চামড়া কেনার পর মাংস পরিষ্কার, লবণ দেওয়া, ধোঁয়া ও পরিবহন মিলিয়ে প্রতিটি চামড়ায় আরও ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ হয়। সব মিলিয়ে যে চামড়া ৮০০ টাকায় পড়েছে, সেটার দাম বলা হচ্ছে ৬০০ টাকা।’

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী থেকে আসা ব্যবসায়ী সুবাস চন্দ্র বলেন, ‘সরকারি রেটে বিক্রির আশায় চামড়া কিনেছিলাম। কিন্তু হাটে ২০ থেকে ৩০ টাকা ফুট দরে চামড়া কেনা হচ্ছে। ফলে প্রতি চামড়ায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।’

স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের কারণেই ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। তার দাবি, এসব ব্যবসায়ী ট্যানারি মালিকদের আশ্বস্ত করেন যে তারা আরও কম দামে চামড়া সংগ্রহ করে দেবেন। ফলে ট্যানারি মালিকরা সরাসরি হাটে না এসে প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কম দামে চামড়া কিনছেন।

মাদরাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। গাইবান্ধা শহরের ফকিরপাড়া হাফেজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষক মাওলানা জোবায়ের জানান, তারা এবারে ১২৭টি গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। পরে প্রতিটি চামড়া গড়ে ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা বাছাইয়ের নামে ভালো চামড়া আলাদা করে নেয়, বাকিগুলো নামমাত্র দামে কিনে নেয়। এতে এতিমদের হক নষ্ট হচ্ছে।’

মাওলানা জোবায়ের আরও বলেন, ‘২০০৭-০৮ সালে আমি নিজে একটি চামড়া ৬ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এরপর থেকেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার ধ্বংস করা হয়েছে।’

তবে সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘হাটে উন্মুক্তভাবে চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে। এখানে সিন্ডিকেটের সুযোগ নেই।’

সরকারি রেটে চামড়া কেনা না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘একটি চামড়ার ৮টি গ্রেড রয়েছে। শুধু ‘এ’ গ্রেডের চামড়া ৬০ টাকা ফুট দরে কেনা হচ্ছে। নিম্নমানের চামড়া ২০ থেকে ৩০ টাকার বেশি দামে কেনা সম্ভব নয়।’’

স্থানীয় চামড়া ক্রেতা আব্দুর রহিম জানান, চামড়া সংরক্ষণেও ত্রুটি রয়েছে। চামড়ায় চাহিদা অনুযায়ী লবণ দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া লাম্পি স্কিন রোগের কারণেও এবারের চামড়ার মান তুলনামূলক খারাপ। এসব কারণেও চামড়ার দাম কম।

পলাশবাড়ী কালিবাড়ি চামড়া হাটের সাধারণ সম্পাদক মিনু মন্ডল বলেন, ‘ট্যানারি মালিক কিংবা তাদের প্রতিনিধিরাই সরকারি দরে চামড়া কিনছেন না। যার ফলে স্থানীয় আড়তদাররাও সরকারি নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কিনতে পারছে না।’

অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের যারা সরকারি রেটে চামড়া কিনছেন তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মূলত স্থানীয় আড়তদাররাও ট্যানারি মালিকদের কাছে জিম্মি।

চামড়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো তথ্যই দিতে পারেনি বিসিক জেলা কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল ফেরদৌস। এক পর্যায়ে তিনি ডিসি অফিস থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে বলেন।

সারাবাংলা/এসএস
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর