শরীয়তপুর: সরকারি কর্মকর্তাদের একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি না থাকার নীতিমালা থাকলেও শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার প্রায় ২১ বছর ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিরুদ্ধে অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতি, বাসায় বসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করা এবং সেবাপ্রার্থীদের হয়রানির অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাসলিমা আক্তার ২০০৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভেদরগঞ্জ উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নেও একই তথ্য রয়েছে। এরপর থেকে তিনি টানা একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি চাকরিবিধি ও মন্ত্রিপরিষদের পরিপত্র অনুযায়ী একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি কর্মরত থাকার নিয়ম না থাকলেও তার ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের মে মাসে তাকে অন্যত্র বদলি করা হলেও দুই মাসের মধ্যে একই বছরের জুলাইয়ে তিনি আবার ভেদরগঞ্জে যোগ দেন।
এদিকে তার বিরুদ্ধে মাসের অধিকাংশ সময় নির্ধারিত সময়ের পরে অফিসে আসা, সকাল ৯টার মধ্যে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে সেটির ছবি হোয়াটসঅ্যাপে ঢাকায় পাঠানো এবং কাউকে কিছু না জানিয়ে অফিস ত্যাগ করার অভিযোগ রয়েছে। সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, তাকে না পেয়ে অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিরে যান। অনেক সময় তিনি জেলা কার্যালয় বা ঢাকায় সরকারি কাজে ব্যস্ত আছেন বলে ফোনে জানান।
সেবাবঞ্চিত দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নের রানু বেগম বলেন, ‘এই অফিসে এসে কর্মকর্তার কার্যালয় বন্ধ দেখছি। অনেক দূর থেকে এসেছি, কী করব বুঝতে পারছি না। বাড়িতে বাচ্চাদের রেখে এসেছি। আমাদের সময়ের মূল্য কেউ বুঝে না। শুনলাম উনি দুপুরের দিকে অফিসে আসেন।’
কাচিকাটা ইউনিয়নের উত্তর মাথাভাঙা এলাকার গর্ভবতী সেলিনা আক্তার ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র (মাতৃত্বকালীন ভাতা) আবেদন সংশোধনের জন্য দুইদিন ধরে কার্যালয়ে গিয়ে কর্মকর্তার দেখা পাননি। তিনি বলেন, ‘আমি এই সপ্তাহে দুইদিন এসে অফিস তালাবদ্ধ পেয়েছি। এখনো পর্যন্ত ম্যাডামের সাক্ষাৎই পেলাম না। এই অফিস মাঝেমধ্যে তালাবদ্ধ থাকে বলে শুনেছি।’
একই ধরনের অভিযোগ করেন রিয়া বেগম, আয়েশা আক্তারসহ আরও কয়েকজন নারী।
ভেদরগঞ্জ উপজেলা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এস. এম. রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি থাকার নিয়ম নেই। সরকার বদলির জন্য পরিপত্র জারি করলেও এই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে কেন মানা হচ্ছে না তা খতিয়ে দেখা দরকার।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘অফিসে না এসে বাসায় বসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার প্রশ্নই আসে না। আমার অফিসে আসতে একটু দেরি হয়, এটা সত্যি।’
তবে অফিসে না এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দেওয়ার প্রমাণ থাকার কথা বললে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমার শত্রুরা আমার ক্ষতি করার জন্য আপনাদের তথ্য সরবরাহ করে। এগুলো অফিসিয়াল তথ্য, আপনি পেলেন কীভাবে?’ এরপর নিজের কাজের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করেননি।
জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের উপ-পরিচালক রাফিয়া ইকবাল বলেন, ‘বাসায় বসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার নিয়ম নেই। তিনি কীভাবে একই কর্মস্থলে বাইশ বছর ধরে আছেন, সেটি আমি জানি না। অফিসে দেরি করে আসা এবং বাসায় হাজিরা খাতা স্বাক্ষরের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, ‘আমাদের সরকারি নির্দেশনা সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে আসতে হবে। তার ছুটির প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে যাবে। একজন কর্মকর্তা কেন এতদিন থেকে একই কর্মস্থলে আছেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’