Tuesday 18 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

কসাইয়ের ঘরে পশুর মাথার শৈল্পিক সংগ্রহশালা

শামীম সবুজ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২২ জুলাই ২০২৬ ০৯:২০ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ ১১:৪৪

কসাই রিপন আলী। ছবি: সারাবাংলা

রাজশাহী: রিপন আলী, বয়স ৪০ বছর। পেশায় একজন কসাই। কিন্তু, তার মনস্তাত্ত্বিক জগৎ তৈরি হয়েছে শৈল্পিক সত্ত্বা নিয়ে। তাইতো গুরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার মাংস বিক্রি করলেও সংগ্রহ করেন সেগুলোর মাথা। যে পশুর মাথা ও শিং সাধারণত কসাইখানা থেকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়, সেই পরিত্যক্ত অংশই তার হাতে পরিণত হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্মে। তিনি ঘরের দেয়ালজুড়ে শিং ঝুলিয়ে তৈরি করেছেন অদ্ভুত এক সংগ্রহশালা।

রিপন আলীর সঙ্গে কথা হয় সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের। তিনি জানান, ২০১৭ সালে কসাইপট্টিতে কাজ করার সময় একটি বড় মহিষের শিং তার নজরে আসে। ওই সময় শিংটির আকর্ষণীয় গঠন তাকে ভাবিয়ে তোলে। তখন একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খেতে থাকে তার মাথায়— ‘এত সুন্দর জিনিস কি শুধু ফেলে দেওয়ার জন্য?’ সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই শুরু হয় নতুন এক যাত্রা।

বিজ্ঞাপন

তবে সেই যাত্রা পথটা মোটেও সহজ ছিল না। পশুর মাথা সংরক্ষণ, দুর্গন্ধ দূর করা ও দীর্ঘদিন পচনমুক্ত রাখার কোনো কার্যকর পদ্ধতি তার জানা ছিল না। এ জন্য তিনি যোগাযোগ করেন পশু বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের সঙ্গে। কিন্তু তাতেও কাঙ্ক্ষিত সমাধান মেলেনি। তবুও হাল ছাড়েননি রিপন। এর পর নিজেই শুরু করেন গবেষণা। বছরের পর বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ব্যর্থতা আর নতুন নতুন পদ্ধতির প্রয়োগের মধ্য দিয়ে অবশেষে তিনি উদ্ভাবন করেন নিজস্ব সংরক্ষণ কৌশল।

বর্তমানে সেই কৌশলেই তৈরি হচ্ছে একের পর এক নান্দনিক শিল্পকর্ম। কোথাও বিশাল মহিষের শিং, কোথাও ছাগলের মাথার শিল্পিত উপস্থাপন, আবার কোনোটি কাঠের ফ্রেমে, কোনোটি দেয়ালসজ্জা হিসেবে। প্রতিটি শিল্পকর্মে ফুটে উঠেছে নিখুঁত কারুকাজ ও দীর্ঘ সময়ের শ্রম। বর্তমানে তার সংগ্রহে রয়েছে শতাধিক শো-পিস।

কসাই রিপন আলী। ছবি: সারাবাংলা

তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। একসময় বাড়িতে পশুর মাথা ও হাড় জমিয়ে রাখার কারণে পরিবার ও প্রতিবেশীদের নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। কিন্তু স্বপ্নের কাছে হার মানেনি সেই বাধাগুলো। সময় বদলেছে। আগে যাদের কাছে তার কাজ অদ্ভুত মনে হয়েছিল, তারাই এখন প্রশংসা করছেন।

প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন ব্যতিক্রমী এই সংগ্রহশালা দেখতে। অনেকেই শিল্পকর্মগুলো কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ দেখছেন নতুন ব্যবসার সম্ভাবনাও। রিপন আলীর দাবি, তিনি শুধুমাত্র বাজার থেকে সংগৃহীত গৃহপালিত পশুর মাথা ও শিং ব্যবহার করেন। কোনো বন্যপ্রাণী বা সংরক্ষিত প্রাণীর অঙ্গ তার কাজে ব্যবহৃত হয় না। বরং তার বিশ্বাস, গৃহপালিত পশুর পরিত্যক্ত অংশ দিয়ে শিল্পকর্ম তৈরির এই উদ্যোগ জনপ্রিয় হলে বন্যপ্রাণীর অঙ্গ দিয়ে ঘর সাজানোর প্রবণতাও কমে আসবে।

এ বিষয়ে রিপন আলী বলেন, ‘শখের বসে ভেড়া-ছাগলের মাথার মাধ্যমে সংগ্রহশালা সাজাতে শুরু করি। বর্তমানে গুরু ও মহিষ ৩০টি এবং ছাগল-ভেড়ার ৭০টি মাথাসহ আমার সংগ্রহশালায় শতাধিক শিংসহ মাথা আছে। আমি এগুলো সংগ্রহ করে কিছু নরমাল কেমিক্যাল ব্যবহার করে সম্পূর্ণ দূর্গন্ধ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশ করি।’

মূলত ভালো লাগা থেকেই সূচনা করলেও এই মাথা রফতানির স্বপ্ন দেখছেন তিনি। রিপন আলী বলেন, ‘ভারতীয় ও তামিল মুভিতে গরু-মহিষের মাথার দারুণ শো-পিচ দেখা যায়। ওইটা থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা দামি শো-পিচ হতে পারে। দেশে ও দেশের বাইরে থেকে কেউ কিনতে চাইলে আমি এখান থেকে শো-পিচ হিসাবে বিক্রি করব।’

তিনি মনে করেন, বিশাল পরিসরে কাজ এগিয়ে নিতে ও বাণিজ্যিকভাবে রফতানি করতে পারলে এর বাজার তৈরি হতে পারে।

সারাবাংলা/পিটিএম