কক্সবাজার: বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও আতঙ্কের জনপদ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা। সীমান্তজুড়ে মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র তৎপরতা, প্রতিনিয়ত গোলাগুলি এবং পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গত কয়েক বছরে এসব মাইন বিস্ফোরণে পা হারিয়েছেন অন্তত ৫০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিক।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ২৭১ কিলোমিটার, যার মধ্যে প্রায় ৯৬ কিলোমিটার অংশই পড়েছে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায়। এই দীর্ঘ সীমান্তে মাইন পুঁতে রাখায় বার বার উঠে এসেছে আরাকান আর্মির নাম।
মাইনের আঘাতে থমকে গেছে জীবন
সীমান্তঘেঁষা আশারতলী গ্রামের ২৪ বছর বয়সি তরুণ নুরুল আমিন জীবিকার তাগিদে পাহাড়ে ফুলের ঝাড়ু কাটতে গিয়ে পড়েছিলেন এই মাইন ফাঁদে। বিকট বিস্ফোরণে মুহূর্তেই উড়ে যায় তার একটি পা। এখন লাঠি কিংবা কৃত্রিম পায়ের ওপর ভর করেই কাটাতে হচ্ছে তার বাকি জীবন। একইভাবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা বদি আলমও মাইন বিস্ফোরণে হারিয়েছেন দুটি পা-ই। পঙ্গুত্ব বরণ করে বিষাদময় জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।
নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম, তুম্ব্রু, চাকঢালা, ছেরার মাঠ, আশারতলী, ঝামছড়ি, লেবুছড়ি ও বান্ডুলাবাজারসহ প্রায় ২৭ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা এখন কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। অনুসন্ধানে এমন সাতজন ভুক্তভোগীর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে, যারা মাইনের আঘাতে নিজেদের পা হারিয়েছেন। তবে দুর্গম যোগাযোগের কারণে আরও অনেকের কাছেই পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
জীবন দিয়েছেন বিজিবি সদস্যও
মাইনের এই ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর সদস্যরাও। তিন মাস আগে নাইক্ষ্যংছড়ির তুম্ব্রু সীমান্তে টহল দেওয়ার সময় মাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন বিজিবি সদস্য নায়েক মো. আক্তার হোসেন। পরবর্তীতে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ দিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সীমান্তের মাইন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে লাল পতাকা স্থাপন করেছে বিজিবি। সংস্থাটির এই পদক্ষেপের কারণে গত ছয় মাসে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা কিছুটা কমলেও, সীমান্তবাসীর মনের ভেতরের আতঙ্ক দূর হয়নি।
একের পর এক অঘটন, প্রাণহানি ও পঙ্গুত্বের মিছিলে নাইক্ষ্যংছড়ির দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে এখন শুধুই অনিশ্চয়তা।