Thursday 23 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

সফল উদ্যোক্তা / সিল বানিয়ে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন শিক্ষার্থী দম্পতি

শামীম সবুজ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৩ জুলাই ২০২৬ ০৯:৩৯

রাজশাহীতে সিল বানিয়ে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন রিজন-রিসা দম্পতি। ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী: এস এম রিজন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং রিসা আফরিন, অ্যাকাউন্টিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। ছাত্রাবস্থায়ই এই দম্পতি সফল উদ্যোক্তা হওয়ার বাসনায় কিছু করার প্রত্যয় নিয়ে সিল মোহর তৈরির ভিন্নধর্মী কাজ নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। তবে এর জন্য তাদের পাড়ি দিতে হয়েছে দুর্গম পথ। আর সেই পথ পাড়ি দিয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করার আগেই সফল উদ্যোক্তর তকমা নিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি প্রতিষ্ঠান। যে প্রতিষ্ঠান থেকে তারা মাসে আয় করছেন লাখ লাখ টাকা।

রিজন-রিসা বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে দৃঢ় সাহসের সঙ্গে শুরু করেন সিল বানানোর কাজ। ব্যর্থতার বেড়াজাল ও নানা সীমাবদ্ধতায় আটকে গেছেন বারবার। কিন্তু দমে যাননি তারা। ফলাফল হিসেবে ‘বেঙ্গলস সিগনেচার’ নামে সিল তৈরির একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন। যে প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে চমকপ্রদ সাড়া ফেলেছে। বিশাল পরিমাণে সিল বিক্রি করে মাসে কয়েক লাখ টাকা উপার্জন করছেন তারা। বর্তমানে দেশের পাশাপাশি বিদেশেও তাদের তৈরি সিলগুলো চলে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের মুখোমুখি হন রিজন-রিসা দম্পতি। এ সময় তারা জানান তাদের শুরু ও সফলতার গল্প। তাদের গল্পের শুরুটা ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, মাত্র ৩৬০ টাকার অর্ডারে মাধ্যমে। ঢাকা থেকে একটি সিল বানিয়ে এনে অর্ডার নিতে শুরু করেন তারা। এর পর বিভিন্ন ফেসবুক, মেসেঞ্জার গ্রুপ ও অফলাইনে পরিচিত জনদের কাছে চান অর্ডার। অল্প সময়ে পান কাঙ্ক্ষিত সাড়াও। কিন্তু তখন তারা ছিলেন ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার। বিনিয়োগের জন্য তাদের ছিল না কোনো অর্থ। এমনকি জানা ছিল না কীভাবে সিল তৈরি করতে হয়, কিংবা কাঁচামাল পাওয়া যায় কোথায়।

এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে আরেকটি বড় বাধা ছিল পরিবার। রিজনের বাবা ছিলেন এমন ব্যবসার ঘোরবিরোধী। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে সিল বানাবেন বিষয়টি ছিল তার কাছে চরম দৃষ্টিকটূ। তবে মায়ের মানসিক সমর্থন এবং বড় ভাইয়ের থেকে পাওয়া কিছু অর্থ এগিয়ে যেতে সাহস জোগায় রিজনকে। সাহস-সহযোগিতা পান বন্ধুদের কাছ থেকেও।

রিজন জানান, অনেক গবেষণার পর চীন থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে কাজ শিখতে মনোযোগী হন তারা। শুরুটা হয় নিজের ঘরের ফ্লোর থেকে। লস ও অনেক সামগ্রী নষ্ট হলেও ধীরে ধীরে কাজ শিখে আধাপাকা টিনের দোকান নিয়ে সেখানেই অফিস বানান তারা। তবে এখন ১ হাজার ৫০০ বর্গফুটের সুসজ্জিত ও বিশাল শো-রুম করেছেন রাজশাহী মহানগরীর ভদ্রার পদ্মা আবাসিক এলাকায়। সেখানে বর্তমানে কর্মরত ১৬ জন শিক্ষার্থী। রাজশাহীতে পার্টটাইম জবের সংকটে থাকা এসব শিক্ষার্থী ‘বেঙ্গলস সিগনেচার’-এ কাজ করতে পেরে বেশ খুশি। তারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি পাচ্ছেন চলনসই সম্মানিও। রিজন-রিসার ‘বেঙ্গলস সিগনেচার’ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৬০০-৭০০ পিস সিল তৈরি পাঠানো হচ্ছে দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন প্রান্তে।

সিল বানানোর কাজ শুরুর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সারাবাংলাকে রিজন-রিসা দম্পতি বলেন, ‘গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে কিছু করার ইচ্ছে থেকেই ভিন্ন কিছু নিয়ে ব্যবসার চিন্তা মাথায় আসে। ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে খেয়াল করলাম অনলাইনে সিল সরবরাহ করে এমন কোনো ভালো প্ল্যাটফর্ম নেই। সেখান থেকে লক্ষ্য স্থির করে কাজ শুরু। যখন কাজ শুরু করি তখন কোনো ধারণা ছিল না কীভাবে কী করতে হবে। সময় নিয়ে ধীরে ধীরে শিখেছি। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা বর্তমানে একটা অবস্থানে আসতে পেরেছি।’

দেশের বাইরেও যাচ্ছে তাদের বানানো সিল এমন দাবি করে রিজন বলেন, ‘বর্তমানে বেঙ্গলস সিগনেচারের মাধ্যমে দেশে ও দেশের বাইরে ফ্ল্যাশ সিল পৌঁছে দিচ্ছি আমরা। বিদেশে আমাদের সিলের বড় একটা চাহিদা রয়েছে। সেটা আমাদের বড় উপার্জনের একটি উৎস।’

রিজন আরও বলেন, ‘সিল একটি সৌখিন প্রোডাক্ট। কাস্টমারের সর্বোচ্চ চাহিদা অনুযায়ী আমরা বানানোর চেষ্টা করি। যেন একটা সিল দেখে বোঝা যায়, নিশ্চয়ই এটা কোনো সৌখিন মানুষের চিন্তা ও মনন থেকে তৈরি। এ ছাড়াও আমাদের অফিসে বর্তমানে ১৫-১৬ জনের কর্মসংস্থানের একটা সুযোগ তৈরি করেছি আমরা। এই ছোট্ট সুযোগ তৈরি করাটাই আমাদের কাছে অনেক বড় পাওয়া।’

রিসা আফরিন বলেন, ‘স্বামীর সঙ্গে যেকোনো পরিস্থিতিতে সফল হতে সংকল্পবদ্ধ ছিলাম। একসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে। তবে আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমাদের স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। অনেকের কাজের ব্যবস্থা করতে পেরেছি। আরও অনেকদূর একসঙ্গে এগিয়ে যেতে চাই।’

এসব বিষয়ে কথা হয় রিসা আফরিনের বাবা রেজাউল করিমের সঙ্গে। তিনি মেয়ে-জামাইয়ের সফলতায় আনন্দ প্রকাশ করে সারাবাংলাকে বলেন, ‘সন্তানদের সফলতা আমাদের আনন্দের কারণ। ওরা সফল হয়েছে, এতে আমরা গর্বিত। যখন তারা এ কাজ শুরু করে তখন উপদেশ দিয়েছিলাম মনোযোগ দিয়ে করতে। তারা তা করেছে এবং আল্লাহ সফলতা দিয়েছে। রিসা-রিজন আরও ভালো কিছু করুক সেই দোয়া করি।’

রিজনের মা রুখসানা বেগম পপি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমার ছেলে ছোটবেলা থেকে অনেক দুষ্টু ছিল। তবে যেকোনো কাজ মনোযোগ দিয়ে করত। প্রথম দিকে ওর বাবা পড়াশোনার ক্ষতি হতে পারে ভেবে এসব কাজ সমর্থন করেনি। তবে আমি চাইতাম ও নিজের মতো করে আগাক। ও সফল হয়েছে, এতে আমরা সবাই খুশি। আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই।’

রিজনের শুভাকাঙ্ক্ষী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই মো. ফারাজী সারাবাংলাকে বলেন, ‘রিজন ক্রিয়েটিভ ছেলে। সবসময় স্বনির্ভর হতে চাইতো। আমি নিজেও উদ্যোক্তা হওয়ায় আমার কাছে পরামর্শ নিত। ও যে ভালো করবে আমি নিশ্চিত ছিলাম। বর্তমানে চমকপ্রদভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ওদের জন্য দোয়া ও শুভকামনা রইল।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর