কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রামে নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও বেড়েছে নদীভাঙন। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে নদীভাঙনের তীব্রতা। জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। জেলার অন্তত ৪৮টি পয়েন্টে নদীর তীর ধসে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও গ্রামীণ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে তিস্তা অববাহিকায়। রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের ডাংরারহাট, কালির মেলা, রামহরি ও চরবিদ্যানন্দের মণ্ডলপাড়া এলাকায় নদীর ভয়াল থাবায় একের পর এক বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও একটি মসজিদ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বহু পরিবার তাদের শেষ সম্বল হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের কালির মেলা এলাকার বতেন মিয়া বলেন, ‘কয়েক দিনে তিস্তার ভাঙনে বেশ কয়েকটি বাড়ি, আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা চালালেও কোনো কাজে আসছে না।’
দুধকুমার নদের অববাহিকায় কুড়িগ্রাম সদরের বানিয়াপাড়া ও ধরলা নদীর অববাহিকায় মোগলবাসা ইউনিয়নের চর কৃষ্ণপুর এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। নদীর তীরবর্তী কৃষিজমি দ্রুত নদীতে চলে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
কুড়িগ্রাম সদরের মোগলবাসা ইউনিয়নের চর কৃষ্ণপুর এলাকার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। যেভাবে ভাঙছে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে আমাদের বাড়ি ঘর, জমি জমা কিছুই থাকবে না।’
অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন নতুন করে বিস্তার লাভ করেছে। কোথাও নদীতীর রক্ষা বাঁধ ঝুঁকিতে, কোথাও গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা হুমকির মুখে। প্রতিদিনই নদীর গর্ভে বিলীন হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।
ভাঙনের কবলে পড়া মানুষের একটাই প্রশ্ন— প্রতিবছর একই দুর্ভোগের শেষ কোথায়? বছরের পর বছর নদীর সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার চেষ্টা করলেও স্থায়ী সমাধান না থাকায় বারবার নিঃস্ব হচ্ছেন তারা। অনেকেই বলছেন, ঘর হারানোর চেয়ে বড় কষ্ট হলো ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা।
স্থানীয়রা দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলা, জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভাঙনের পরিধি আরও বাড়বে এবং ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
পানি কমলেও কুড়িগ্রামের নদীপাড়ে স্বস্তি ফেরেনি। বরং নদীর আগ্রাসনে প্রতিদিন নতুন করে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, ভিটেমাটি ও জীবিকার শেষ আশ্রয়। নদীভাঙন এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি হয়ে উঠেছে হাজারো পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের নির্মম বাস্তবতা।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের ৪৮ টি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে, এর মধ্যে ৩৮ টি স্থানে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।