ঢাকা: কম্বোডিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীকে পাচার, পাসপোর্ট ও অর্থ জোরপূর্বক নিয়ে নেওয়া, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার অভিযোগে চক্রের মূল হোতা মো. রুবেলকে (২৯) গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেলে সিআইডি’র অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু তালেব এ বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘সিআইডির মানবপাচার শাখা (টিএইচবি) ইউনিট গত ২১ জুলাই বিকেলে ফরিদপুর জেলার চরভদ্রাসন থানা এলাকা থেকে মো. রুবেলকে (২৯) গ্রেফতার করে। বাদী ও ভুক্তভোগী নারী আর্থিক সংকটের কারণে স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ঋণ গ্রহণ করেন। কিস্তি সংগ্রহের সুবাদে বাদী ওই এনজিওতেই কর্মরত ও বর্তমানে গ্রেফতারকৃত রুবেলের সঙ্গে পরিচিত হন। রুবেল ভুক্তভোগী নারীকে বিদেশে গিয়ে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার প্রস্তাব দেন ও কম্বোডিয়ায় কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখান।’
আবু তালেব বলেন, ‘ভুক্তভোগীর আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় অভিযুক্ত রুবেল তাকে এনজিও থেকে ১ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী ওই ঋণের টাকা গ্রহণ করলে অভিযুক্ত রুবেল তার কাছ থেকে ১ লাখ টাকা নিয়ে নেন এবং তার পাসপোর্টও সংগ্রহ করেন। এরপর কম্বোডিয়ায় চাকরির ব্যবস্থা করার কথা বলে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে পর্যায়ক্রমে আরও অর্থ গ্রহণ করা হয়। ভুক্তভোগী বিভিন্নভাবে ধার-দেনা করে অভিযুক্তের দেওয়া ব্যাংক হিসাবে ২ লাখ টাকা পাঠান এবং পরবর্তীতে সবমিলিয়ে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে মোট ৪ লাখ টাকা নেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘পরবর্তীতে ভুক্তভোগীকে ভিসা ও বিমানের টিকিট দিয়ে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর চক্রের অন্যান্য সহযোগীরা তার পাসপোর্ট ও সঙ্গে থাকা অর্থ জোরপূর্বক নিয়ে নেয় এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করে অনিচ্ছাকৃত কাজ করানো এবং তার উপার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। ভুক্তভোগী বাদীকে একপর্যায়ে বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। এতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন এবং দেশে ফিরতে চাইলে প্রাণনাশ ও অন্য দালালের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে ফিরে আসার চেষ্টা করেন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টার এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও মানবিক সংস্থার সহযোগিতায় গত ১ জুলাই তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে সংশ্লিষ্টদের সহায়তায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেন।’
সিআইডিরর এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মামলাটির তদন্তে ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান পরিচালনা করে টিএইচবি ইউনিট। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ জুলাই ফরিদপুর জেলার চরভদ্রাসন থানা এলাকা থেকে মামলার প্রধান অভিযুক্ত মো. রুবেলকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর অভিযুক্তকে আইনানুগভাবে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং আদালতের আদেশে তার জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। জবানবন্দি ও তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মামলার অন্যান্য অভিযুক্ত, মানবপাচার নেটওয়ার্ক, আর্থিক লেনদেন, বিদেশে অবস্থানরত সম্ভাব্য ভুক্তভোগী এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্তে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিআইডির মানবপাচার শাখা (টিএইচবি) ইউনিট। সংঘবদ্ধ আন্তঃদেশীয় মানবপাচারের এই চক্রের মাধ্যমে আরও কোনো বাংলাদেশি নাগরিক একইভাবে পাচার বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’
সংস্থাটি জানিয়েছে, সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থান বা অভিবাসনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে না পড়ে যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ যেতে দেশের নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানায়। বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণা, মানবপাচার, জিম্মি বা নির্যাতনের কোনো তথ্য জানা থাকলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অথবা সিআইডিকে অবহিত করার জন্যও অনুরোধ করেছে এ সংস্থা।