কক্সবাজার: কক্সবাজার ও এর আশেপাশের অঞ্চলকে একটি আধুনিক, পরিকল্পিত এবং আকর্ষণীয় আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে শুরু হয়েছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) বাস্তবায়ন করছে “কক্সবাজার জেলার মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন (১ম সংশোধিত)” শীর্ষক একটি মাস্টারপ্ল্যান সমীক্ষা প্রকল্প। অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধ, ভূমির যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। এই সমীক্ষা প্রকল্পের অধীনে সমগ্র কক্সবাজার জেলার জন্য দুটি বিশেষ পরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে তা এই বছর শেষ হওয়ার কথা এমনটা জানা গেছে।
লে. কর্ণেল আবু নাঈম মো. তালাত প্রতিবেদককে এ তথ্য জানান।
ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান
কক্সবাজার জেলার ৯টি উপজেলা চকোরিয়া, ঈদগাঁও, পেকুয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফ এবং সমগ্র সমুদ্র সৈকত এলাকাসহ মোট ৬ ৯০.৬৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকার জন্য বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
স্ট্রাকচার প্ল্যান
সমগ্র কক্সবাজার জেলার ২,৪৯১.৮৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকার সার্বিক অবকাঠামোগত কাঠামোগত পরিকল্পনা বা স্ট্রাকচার প্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের সুদূরপ্রসারী উন্নয়নে দিকনির্দেশনা দেবে।
প্রকল্প বাজেট ও বর্তমান অগ্রগতি
১৭৪.৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২১ সালের এপ্রিল মাস থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের আগেই দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে প্রকল্পের কাজ। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী, গত জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত প্রকল্পটির ৭৭% কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
মহাপরিকল্পনার প্রধান উপাদানসমূহ
মাস্টারপ্ল্যানটি ২০২৩ থেকে ২০৪৩ মেয়াদের কথা মাথায় রেখে কয়েকটি বিশেষ উপ-পরিকল্পনার সমন্বয়ে গঠিত:
স্ট্র্যাটেজিক পলিসি প্ল্যান (৫০ বছর): দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পলিসি নির্ধারণের দিকনির্দেশনা। ভূমি ব্যবহার ও ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (১০-২০ বছর): নির্দিষ্ট জোন বা অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। পর্যটন খাতের টেকসই বিকাশ, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও অবকাঠামো খাতের একীভূত উন্নয়ন করা হবে।
যোগাযোগ ও পরিবহন প্ল্যান
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ, যাতায়াত সহজ ও পরিবেশবান্ধব করা। ড্রেনেজ, স্যানিটেশন ও ইউটিলিটি প্ল্যান: জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য সেবা নিশ্চিত করা।
দুর্যোগ ও সংকট ব্যবস্থাপনা প্ল্যান
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস ও জানমালের সুরক্ষায় বিশেষ দিকনির্দেশনা।স্মার্ট সিটি মডেল ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (ঝউএ-৩ ও ঝউএ-১১) অনুসরণে আবাসন, শিক্ষাসুবিধা ও সর্বস্তরের নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন। কক্সবাজারের দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া জনসংখ্যা ও পর্যটন চাহিদাকে সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনতেই এই সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে।
কেন এই মহাপরিকল্পনা?
বর্তমানে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে পর্যটক বাড়ার পাশাপাশি অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ ও ভূমির অপব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হলো,ভূমির সঠিক ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, যত্রতত্র ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, পর্যটন শিল্পের উপযোগী উন্নত পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা,পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষের আশা, ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার জেলা একটি বিশ্বমানের সুপরিকল্পিত পর্যটন কেন্দ্রে রূপ নেবে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে যে ৫০ মিটার ও ৫০০ মিটারের বিধিনিষেধ আছে, তা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার(২৩ জুলাই) সচিবালয়ে কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও এ সময় কথা বলেন।অর্থমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজারে ৫০ মিটার ও ৫০০ মিটারের বিভিন্ন বিধিনিষেধ নতুন করে বিবেচনা করতে হবে। যেখানে পর্যটন উন্নয়ন হবে, সেখানে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগ থাকতে হবে। তবে পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করেই উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ রক্ষা করা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। তবে এমন কঠোর বিধিনিষেধ থাকা উচিত নয়, যাতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উপকূলীয় এলাকায় পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়েছে। বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মানের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ছোট দেশ। তাই পরিকল্পিতভাবে বহুতল বা উল্লম্ব উন্নয়ন উৎসাহিত করতে হবে। তা না হলে শিল্পাঞ্চল, জলাধার ও কৃষিজমি রক্ষা করা কঠিন হবে। বিশ্বের বড় পর্যটন নগরীগুলোও বহুতল ভবনভিত্তিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। কক্সবাজারেও সেই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হবে।
অর্থমন্ত্রী গণমাধ্যমকে জানান, কক্সবাজার ঘিরে সরকারের বড় পরিকল্পনা আছে। সেখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ এগোচ্ছে, রেল যোগাযোগ চালু হয়েছে। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা হচ্ছে। এসব অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে কক্সবাজারকে আধুনিক ডিজিটাল পর্যটন নগরীতে রূপ দেওয়া হবে। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে কক্সবাজারকে অন্যতম প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পর্যটন, বাণিজ্য ও সেবা খাতের বিকাশের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে এই জেলার অবদান আরও বাড়বে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হবে। ২০২৬ সালের মধ্যে এ পরিকল্পনা প্রস্তুত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, মাস্টারপ্ল্যানের লক্ষ্য কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করা। সেই সঙ্গে বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পর্যটন এলাকা নির্ধারণ, মেরিন ড্রাইভ ও উপকূলীয় এলাকার বিদ্যমান বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতকে জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকা শক্তিতে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে। পর্যটন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি এবং বিদেশি পর্যটক আকর্ষণও এ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
কক্সবাজারে বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র, নিরাপদ পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ও পানি শোধনাগারসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা আছে।