Monday 27 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে বিষমুক্ত আনারস চাষের দিকে ঝুঁকছেন মধুপুরের চাষীরা

মহিউদ্দিন সুমন ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৭ জুলাই ২০২৬ ০৮:৩৪ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৬ ০৯:০৩

বিষমুক্ত আনারস চাষী সোহেল রানা।

টাঙ্গাইল: টাঙ্গাইলে জি আই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত মধুপুরের আনারসের স্বাদ ও গন্ধ অতুলনীয়। কিন্তু কিছু অসাধু লোভী কৃষক অধিক লাভের আশায় অত্যধিক মাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহার করে আনারসের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। মধুপুরের আনারসের হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে স্বল্প খরচ ও ভালো দাম পাওয়ার কারণে কৃষকরা এখন অর্গানিক পদ্ধতিতে বিষমুক্ত, নিরাপদ আনারস চাষে ঝুঁকছেন।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আনারসের রাজধানী হিসেবে খ্যাত মধুপুরে বাণিজ্যিক চাষীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি দেশব্যাপী রয়েছে এই ফলের ব্যাপক চাহিদা। এ সুযোগে আনারস চাষীরা বেশি লাভের আশায় আনারসের আকার, রং উজ্জ্বল ও অসময়ে বাজারে উঠানোর জন্য নানা ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে ভালো দাম পাওয়ার আশায় ছোট ও বড় গাছে একসঙ্গে ফুল আসার জন্য রাসায়িক মিশ্রণ স্প্রে করে, যা সিজার হিসেবে পরিচিতি। এ সময় নিয়মিত হরমোন এবং পাকানোর জন্য নিয়ন্ত্রিত হরমোন প্রয়োগের ১০-১২ দিন পরেই আনারস হারভেস্টের উপযোগী হয়। আনারস দেখতে হলুদ বর্ণ হলেও সেটা বিষাক্ত ফলে পরিণত হয়। স্বাদ ও ঘ্রাণ ঠিক থাকে না। এ কারণেই অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে আকারে বড় এবং আকর্ষণীয় রং তৈরি হলেও নষ্ট হচ্ছে আনারসের স্বাদ-গন্ধ ও গুণাগুণ।

বিজ্ঞাপন

তবে মানুষ এখন সচেতন হওয়ার কারণে এবং বিষযুক্ত আনারস না কেনার কারণে মধুপুরে বিষমুক্ত আনারসও চাষ হচ্ছে। আনারসের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সোহেল রানাসহ অনেক কৃষক এখন নিরাপদ আনারস চাষ করছেন।

সরেজমিনে জেলার মধুপুর উপজেলার ফুলবাগ চালা ইউনিয়নের হাগুড়া কুড়ী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, আনারস চাষী সোহেল রানা আনারস বিক্রির উদ্দেশ্যে খেত থেকে ফল সংগ্রহ করছেন। এ সময় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে সোহেল রানার কথা হয়।

সোহেল রানা জানান, ২০২৫ সালে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর এর আর্থিক সহায়তায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসএসএস এর সহযোগিতায় এ কাজে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই সংস্থা থেকেই অনুদান পাওয়া ৬০ হাজার টাকা এবং তার নিজস্ব অর্থায়নে নিরাপদ আনারস প্রকল্পের কাজ শুরু করেন। মোট চার বিঘা (১২০) শতাংশ জমিতে নিরাপদ আনারসের আবাদ করেন। সেখানে হানিকুইন জাতের ২৪ হাজার আনারসে চারা রোপণ করেন। সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে জৈব সার প্রয়োগ করে নিরাপদ আনারস চাষ করেন। চারা রোপণ থেকে শুরু করে আনারস হারভেস্ট করা পর্যন্ত আঠারো মাসে পর্যায়ক্রমে মোট ৫০ জন শ্রমিক তার এ প্রকল্পে কাজ করেছেন। তাদের বেতন ও অন্যান্য সব খরচ বাবদ তার ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এরইমধ্যে সোহেল রানা মোট ৫ লাখ ২৮ হাজার টাকার আনারস বিক্রি করেছেন। আরো প্রায় ৭০ হাজার টাকা আনাস বিক্রি করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি জানান, বর্তমানে যেখানে অতিরিক্ত রাসায়নিক কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো প্রতি পিস বড় সাইজের আনারস ২৫-৩০ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি হয়। সেখানে অর্গানিক পদ্ধতিতে নিরাপদ আনারস বিক্রি করছেন ৪০-৪৫ টাকা দরে।

সোহেল রানা আরও জানান, মধুপুরের আনারসের স্বাদ ও গন্ধ অতুলনীয়। বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করতে গিয়ে বেশি লাভের আশায় অনেক চাষীরা নানা ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। এতে সুনাম হারাতে বসেছে মধুপুরের আনারসের। তার মতো এই পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক কৃষক আনারসের স্বাদ ও গন্ধ তার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে নিরাপদ আনারস চাষ করছেন। চাষাবাদে খরচ কম ও দাম ভালো পাওয়া আমার মতো আরও অন্যান্য চাষিরা বিষমুক্ত আনারস চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা।

তিনি আরও জানান, তাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্থানীয় এলাকার মিজানুর রহমান সবুজ, রনি মিয়া, কল্যাণ ম্যাথিউ নিরাপদ আনারস চাষ শুরু করেছেন। তবে মধুপুর গড় অঞ্চলে প্রায় শতাধিক চাষী এখন নিরাপদ আনারস চাষে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

নিরাপদ আনারসের বাজারজাত সম্পর্কে জানতে চাইলে সোহেল রানা জানান,পুরাতন চাষী হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানের ক্রেতারা তাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। উত্তরবঙ্গের নীলফামারী, রংপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ এবং ঢাকা থেকে ক্রেতারা তার খেত থেকে সরেজমিনে এসে আনারস কিনে নিয়ে যান। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার নিজের ফেসবুক পেজ ‘এস আর ব্লগ বিডি’ এর মাধ্যমে আনারসের অর্ডার নিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন সোহেল রানা।

কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো ও অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ করা আনারস চেনার উপায় সম্পর্কে সোহেল রানা জানান, প্রাকৃতিকভাবে পরিপক্ব আনারসের গোড়ার দিকে হলুদ রং হবে এবং উপরের দিকটা সবুজ থাকবে। আনারস কাটলে সুঘ্রাণ বের হবে এবং খেতে সুমিষ্ট হবে। অন্যদিকে হরমোন দিয়ে পাকানো আনারস সম্পূর্ণ হলুদ বর্ণের হবে। দেখতে আকর্ষণীয় হলেও সুঘ্রাণ বের হবে না। খেতে সুমিষ্ট হবে না।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসএসএস এর নির্বাহী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সন্তোষ চন্দ্র পাল জানান, সংস্থাটি শুরু থেকেই জেলার মধুপুর গড় ও পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন নতুন কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে আনারস চাষিদের ক্ষুদ্র অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে আসছে। বর্তমানে সাসটেইনেবল মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন প্রজেক্ট (স্মার্ট) প্রকল্পের মাধ্যমে ১ হাজর ৮০০ সদস্যদের ক্ষুদ্র অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের উপকার ভোগীরা নিরাপদ আনারস চাষ করে আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আশেক পারভেজ জানান, টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় অঞ্চলে ছায়ান্টকিউ, হ্যানি কুইন ও ফিলিপাইন থেকে আমদানিকৃত এমডি-২ জাতের আনারস আবাদ হচ্ছে। অধিক মুনাফার আশায় আনারস চাষীরা মাত্রাতিরিক্ত হরমোন প্রয়োগ করে থাকে। এই আনারস খেলে মানব দেহে দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগ হতে পারে। এমনকি লিভার ও কিডনি নষ্ট হওয়াসহ ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। তাই জি আই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি, মধুপুরের আনারসের সুঘ্রাণ ও অতুলনীয় স্বাদ এবং আনারসের ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কেমিক্যাল মুক্ত আনারস চাষ করতে চাষীদের সবসময়ই উদ্বুদ্ধ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, বিশ্ববাজারে আনারসের ব্যাপক চাহিদা। বিশ্বজুড়ে আনারস ফল হিসেবে ও আনারসজাত পণ্য রফতানিতে প্রথম সারিতে রয়েছে থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন। সুতরাং নিরাপদ আনারস চাষের মাধ্যমে আমাদের দেশে আনারস থেকে ভ্যালু এডিশনের মাধ্যমে, খাদ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু বেভারেজ কোম্পানি আনারসের জুস বিদেশে রফতানি করছে এবং এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা সরকারের কাছে নানা প্রকল্প প্রস্তাব আকারে পাঠিয়েছি।

সারাবাংলা/এএ
বিজ্ঞাপন

আরো

মহিউদ্দিন সুমন - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর