নীলফামারী: ‘একদিন কাজ করতে না পারলেই সংসারে চুলা জ্বলে না। আজ সাইকেল কাঁধে নিয়ে কোমরসমান পানি পার হয়ে কাজে যাচ্ছি। আর কতদিন এভাবে চলব জানি না’- কথাগুলো বলতে বলতে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার জোড়াবাড়ী ইউনিয়নের পুব হলহলিয়া গ্রামের দিনমজুর জসিম উদ্দিন।
গতকাল রোববার (২ আগস্ট) দুপুরে হরিডারা নদীর ওপর নির্মিত স্লুইসগেট ধসে পড়ে একটি বসতবাড়ির একাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
সোমবার (৩ আগস্ট) সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, স্লুইসগেট ভেঙে যাওয়ায় যাতায়াতের একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে গেছে। তাই স্থানীয়রা কোমরসমান পানিতে নেমে সাইকেল ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নদী পার হচ্ছেন। শিশু, নারী, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষ সবাই পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
জসিম উদ্দিন স্থানীয় একটি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। প্রতিদিন কাজ না করলে কোনো মজুরি পান না। তিনি বলেন, ‘অন্য রাস্তা দিয়ে গেলে ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। এত দূর ঘুরে গেলে কাজে পৌঁছাতে দেরি হয়, খরচও বাড়ে। তাই বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই পানি পার হচ্ছি।’
স্থানীয়দের জানায়, এই স্লুইসগেট দিয়েই কয়েকটি গ্রামের মানুষের যাতায়াত এবং আশপাশের কৃষিজমির পানি নিয়ন্ত্রণ করা হতো। স্লুইসগেট ধসে যাওয়ার পর শুধু একটি বাড়িই নদীগর্ভে বিলীন হয়নি, বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পুরো এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ পরিবার এখন দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

পানির ভেতর দিয়ে সাইকেল নিয়ে পার হচ্ছেন এক ব্যক্তি।
সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন ভ্যান ও অটোরিকশা চালকরা। যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
ভ্যানচালক রশিদুল ইসলাম বলেন, ‘আগে এই রাস্তা দিয়েই সহজে মেইন রোডে উঠে যাত্রী পেতাম। এখন গ্রামের ভেতর দিয়ে ৭-৮ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হচ্ছে। যেতে-আসতেই গাড়ির ১৫-২০ কিলোমিটারের চার্জ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সেই অনুযায়ী ভাড়া পাওয়া যায় না।’
অটোরিকশাচালক মো. শাহিন আলম বলেন, ‘এই রাস্তা বন্ধ হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি আমাদের হয়েছে। দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে গিয়ে ব্যাটারির চার্জ দ্রুত শেষ হয়ে যায়। আগের মতো ট্রিপ দিতে পারি না। আয় কমে গেছে, কিন্তু সংসারের খরচ তো আর কমেনি।’
স্থানীয় ভ্যানচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, গাড়ি চালিয়েই সংসার চলে। যেদিকে বেশি ভাড়া পাওয়া যেত, সেদিকে এখন আর যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত অন্তত একটি অস্থায়ী পারাপারের ব্যবস্থা করা দরকার।’
স্থানীয় কৃষক মো. আহিনুর ইসলাম বলেন, ‘এই স্লুইসগেটের ওপর নির্ভর করে শত শত বিঘা জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়। এখন পানি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন।’
জোড়াবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হাবীব বাবু বলেন, ‘আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছি। আপাতত মানুষের চলাচলের জন্য একটি অস্থায়ী সাঁকো নির্মাণ করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন।’
উল্লেখ্য, রোববার দুপুরে হরিডারা নদীর ওপর নির্মিত স্লুইসগেটটি ধসে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গেটের নিচে ইঁদুরের গর্ত দিয়ে পানি প্রবেশের পর ভাঙনের সৃষ্টি হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করে এবং পাশের একটি বসতবাড়ির বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
ভাঙা স্থানে কোনো অস্থায়ী সেতু বা বিকল্প পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে কোমরসমান পানি পেরিয়ে নদী পার হচ্ছেন শত শত মানুষ। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত অস্থায়ী পারাপারের ব্যবস্থা, স্থায়ী স্লুইসগেট নির্মাণ এবং নদীভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
ডোমার উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী ফিরোজ আলম বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ইঁদুরের গর্ত দিয়ে পানি প্রবেশের কারণে ভাঙনের সূচনা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হবে।’