সুনামগঞ্জ: সাধারণত যেকোনো সড়ক প্রশস্ত করার সময় বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা অন্যান্য স্থাপনা সরিয়েই কাজ করা হয়। তবে সুনামগঞ্জ পৌরশহরের প্রধান সড়ক ‘ডি এস রোড’-এ স্বাভাবিক এই ঘটনাটি ঘটেনি। সড়কের মাঝে বিদ্যুতের খুঁটি রেখেই এটি দ্বিগুণ প্রশস্ত করা হয়েছে। ফলে খুঁটির কারণে এই সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।
এই সড়কে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন যানবাহনের চালক এবং নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দাবি, সড়কের মাঝে বিদ্যুতের খুঁটি থাকায় প্রতিদিন কোনো না কোনো যানবাহন দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। গত দেড়বছরে এখানে অন্তত শতাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিভাগ ও পৌর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ঠেলাঠেলির কারণেই খুঁটিগুলো সরানো হচ্ছে না। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ ও পৌর কর্তৃপক্ষের মধ্যে গত দেড় বছর ধরে এ নিয়ে চিঠি চালাচালি চলছে বলে উভয়পক্ষ থেকেই নিশ্চিত করা হয়েছে।
ডি এস রোডটি সুনামগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র আলফাত স্কয়ার থেকে ষোলঘর হয়ে সুরমা নদীর তীরের ধারারগাঁও পর্যন্ত বিস্তৃত। সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন শহরের ষোলঘর, নবীনগর, ধোপাখালী, শহরতলির কুরবাননগর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম এবং সদর উপজেলার সুরমা, জাহাঙ্গীরনগর, রঙ্গারচর ইউনিয়নসহ দোয়ারাবাজার উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের লাখো মানুষ যাতায়াত করেন।
২০২৪ সালের শেষের দিকে ডি. এস রোডের ষোলঘর এলাকার জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে ধোপাখালী শ্মশানঘাট পর্যন্ত সড়কটি প্রশস্ত করা হয়। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অফিসের সামনে চারটি বিদ্যুতের খুঁটি সড়কের মাঝখানে রেখেই কাজ শেষ করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, সড়কের একদম মাঝখানে একটিসহ মোট চারটি খুঁটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। খুঁটিগুলো সরানোর জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ ও পৌর কর্তৃপক্ষকে বারবার অনুরোধ করা হলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। ফলে ক্রমাগত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন যানবাহন চালকেরা।
শহরের ষোলঘর এলাকার বাসিন্দা মো. আব্বাস আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘উচিত ছিল খুঁটি সরিয়ে সড়ক বড় করা, কিন্তু চারটি খুঁটি সড়কে রেখেই তা করা হয়েছে। এর মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অফিসের সামনের খুঁটিটির কারণে বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। কয়েকদিন আগেও চারটি গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। বিষয়টি বিদ্যুৎ অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী ও পৌরসভাকে জানানো হলেও খুঁটি সরানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।’
শহরতলির ধারারগাঁও গ্রামের তাজুল ইসলাম সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ষোলঘর সড়ক দিয়ে প্রতিদিনই শহরে আসা-যাওয়া করি। একদিন চোখের সামনে কারেন্টের খুঁটিতে ধাক্কা লেগে একটি অটোরিকশা উলটে যেতে দেখেছি। গাড়ির গতি কম থাকায় সেবার যাত্রীরা বড় বিপদ থেকে রক্ষা পান। খুঁটিগুলো সরিয়ে নিলে যান চলাচল নিরাপদ হতো।’
উছারগাঁও গ্রামের রিকশাচালক নুর মোহাম্মদ সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে জানান, ষোলঘরে সড়কের মাঝে খুঁটি থাকার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। তার পরিচিত কয়েকজন রিকশাচালকের রিকশা এখানে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পৌরসভায় গিয়েও কোনো সমাধান পাননি তারা।
আরপিনগর এলাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক মো. জিলকত মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘সুরমা নদীর তীরের ধারারগাঁও বা নবীনগর থেকে যাত্রী নিয়ে শহরে আসার সময় ধোপাখালী শ্মশান এলাকার বাঁক পার হলেই হঠাৎ সড়কের মাঝে খুঁটি পড়ে। ফলে চালকেরা আকস্মিক বিপদে পড়েন। খুঁটিগুলো দ্রুত সরানো হলে সবার জন্য উপকার হতো।’
নবীনগরের বাসিন্দা ও উন্নয়নকর্মী সালেহীন চৌধুরী শুভ সারাবাংলাকে বলেন, ‘ডি এস রোড সুনামগঞ্জ পৌর শহরের সবচেয়ে ব্যস্ততম সড়ক। শহরের বাসিন্দাদের পাশাপাশি দুই উপজেলার লাখো মানুষ এটি ব্যবহার করেন। অথচ মাঝসড়কে খুঁটি রেখে সড়ক প্রশস্ত করে পৌরসভা চরম খামখেয়ালিপনার পরিচয় দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ও পৌর কর্তৃপক্ষ হয়তো কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনার জন্য অপেক্ষা করছে।’
নিরাপদ সড়ক চাই সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ নুর সারাবাংলাকে বলেন, ‘সড়কের মাঝে খুঁটি রেখে পথ প্রশস্ত করার কারণে চালকেরা নিয়মিত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। স্থানীয়দের তথ্যমতে, দেড় বছরে অন্তত শতাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমরা উভয় কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বললেও তারা দায় একে অপরের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।’
অভিযোগের বিষয়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী কালী কৃষ্ণ পাল সারাবাংলাকে বলেন, ‘সড়কটি প্রশস্ত করার সময় চারটি বৈদ্যুতিক খুঁটি মাঝখানে পড়ে যায়। এগুলো অপসারণের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কাজ শুরুর সময় তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী খুঁটি সরানোর যে প্রাক্কলন (বিল) ধরেছিলেন, তা পরিমাণের চেয়ে বেশি হওয়ায় পৌরসভা থেকে পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে কথা হয়েছে, তিনি খুঁটিগুলো সরিয়ে দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যেই সমাধান হবে।’
এদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সুনামগঞ্জ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাসেল আহমাদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘রাস্তা প্রশস্ত করার কাজ শুরুর সময়ই খুঁটি অপসারণের খরচের বিষয়টি পৌরসভাকে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা তড়িঘড়ি করে রাস্তার ঢালাই দিয়ে ফেলে। পরবর্তী সময়ে খুঁটি স্থানান্তর বা নতুন লাইন নির্মাণের প্রয়োজনীয় বাজেট না পাওয়ায় তা সরানো সম্ভব হয়নি। তবে জনস্বার্থে খুঁটিগুলো সরাতে আমাদের সবধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।’ প্রয়োজনীয় খরচ পাওয়া মাত্রই দ্রুত রাস্তা থেকে খুঁটিগুলো অপসারণ করা হবে বলে জানান তিনি।