Sunday 16 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

সবুজের বুকে গোলাপি আভা ছড়াচ্ছে সোনাকান্তের পদ্মরাজ্য

আশরাফুল ইসলাম জয়, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৬ আগস্ট ২০২৬ ০৮:৪৪ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ ১১:১৭

সোনাকান্ত বিলের পদ্মরাজ্য। ছবি: সংগৃহীত

সিরাজগঞ্জ: বর্ষার জলে যখন মাঠ-ঘাট একাকার, তখন সেই জলের বুকজুড়ে প্রকৃতি যেন এঁকে দিয়েছে গোলাপি-লালের নান্দনিক ছবি। কোথাও ফুটে আছে কচি গোলাপি পদ্ম, কোথাও পূর্ণ প্রস্ফুটিত লালচে ফুল। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে দুলছে অসংখ্য পদ্ম। দূর থেকে মনে হয়, পানির ওপর বিছানো হয়েছে সবুজের গালিচা, তার ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রঙিন ফুলের পসরা। এমনই এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের দেখা মিলেছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার সোনাকান্ত বিলে।

প্রায় দুই বছর পর এবার অসংখ্য পদ্মফুলে সেজেছে উপজেলার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের আমডাঙ্গা গ্রামের পাশের এই বিল। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রতিদিনই প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ নিভৃতে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করছেন বিলপাড়ে। মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধারণ করছেন পদ্মে ভরা বিলের ছবি ও ভিডিও।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বিঘা নিচু জমি নিয়ে সোনাকান্ত বিলের বিস্তৃতি। ব্যক্তিমালিকানাধীন এসব জমি বর্ষায় পানিতে তলিয়ে গিয়ে বিলে পরিণত হয়। বছরের অন্য সময়ে সেখানে ইরি-বোরো ধানের আবাদ হলেও বর্ষাকালে পানির রাজত্বে জমিগুলো হয়ে ওঠে জলজ উদ্ভিদের স্বর্গরাজ্য। বিলের জমির মালিক সড়াতৈল, আমডাঙ্গা, অলিপুর ও বাগদা গ্রামের বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২২ সালে সোনাকান্ত বিলে কিছু পদ্মফুল ফুটেছিল। তবে তখন ফুলের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম। পরের বছর বন্যা না হওয়ায় পদ্মের বিস্তারও তেমন দেখা যায়নি। এবার বড় ধরনের বন্যা না হলেও টানা ও প্রচুর বৃষ্টিতে বিলের নিচু জমিতে পর্যাপ্ত পানি জমে যায়। অনুকূল পরিবেশ পেয়ে পদ্মগাছগুলো দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ফলে এবার পুরো বিলজুড়েই যেন পদ্মের উৎসব শুরু হয়েছে।

সড়াতৈল গ্রা‌মের বা‌সিন্দা সে‌কেন্দার আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘শুরুতে সোনাকান্ত বিলে দুয়েকটি পদ্মগাছ প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়। সময়ের সঙ্গে সেগুলো বিস্তৃত হতে হতে এখন বিলের বড় একটি অংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১৪ সাল থেকে বর্ষা মৌসুমে এ বিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পদ্মফুল ফুটতে দেখা যায়। যে বছর বিলে পর্যাপ্ত পানি থাকে না, সে বছর পদ্মও কম ফোটে। এবার প্রচুর বৃষ্টির কারণে বিল পানিতে পূর্ণ হওয়ায় পদ্মের সমারোহ হয়েছে।’

সোনাকান্ত বিলের পদ্মরাজ্য। ছবি: সংগৃহীত

সোনাকান্ত বিলের পদ্মরাজ্য। ছবি: সংগৃহীত

তিনি বলেন, ‘পদ্মফুলের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে প্রতিদিনই অনেক মানুষ এখানে আসছেন। কিন্তু অলিপুর-সড়াতৈল আঞ্চলিক সড়ক থেকে বিলটির দূরত্ব আধা কিলোমিটারের কিছু বেশি হলেও সেখানে যাওয়ার ভালো কোনো রাস্তা নেই। আলপথ ধরে বিলের কাছে যেতে হয়। বৃষ্টির দিনে সেই পথ কাদায় পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় দর্শনার্থীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়।’

পদ্ম দেখতে আসা সা‌দিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘চারপাশে সারি সারি গোলাপি ও লাল পদ্ম, তার মাঝখানে সবুজ পাতার দোলা দৃশ্যটি চোখ জুড়িয়ে দেয়। মনে হয়, শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে অন্য এক শান্ত পৃথিবীতে চলে এসেছি। তবে বিল পর্যন্ত ভালো যোগাযোগব্যবস্থা থাকলে আরও বেশি মানুষ এখানে আসতে পারতেন।’

বিলের ভূমির মালিক বাগদা গ্রামের রফিকুল ইসলাম ও আমডাঙ্গা গ্রামের আব্দুস সাত্তার সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রায় এক যুগ ধরে বর্ষা এলেই সোনাকান্ত বিলে পদ্মফুল ফুটতে দেখা যায়। তবে এবার ফুলের সংখ্যা ও বিস্তার অন্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। পানির ওপর ভেসে থাকা পদ্মপাতা আর তার মাঝখানে ফুটে থাকা ফুল দূর থেকে দেখলে মনে হয়, প্রকৃতি নিজ হাতে সবুজের চাদরে রঙের তুলির আঁচড় এঁকেছে।’

উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন সুমীর সঙ্গে কথা হয় সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘পদ্ম একটি জলজ উদ্ভিদ। বিভিন্ন পাখির মাধ্যমে এর বীজ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সেই বীজ থেকে গাছ জন্ম নেয় এবং ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। সোনাকান্ত বিলে দীর্ঘদিন পর এবার ব্যাপকভাবে পদ্মফুল ফুটেছে। আমি নিজেও বিলটি পরিদর্শন করেছি। বর্তমানে প্রচুর দর্শনার্থী সেখানে যাচ্ছেন। সাময়িক সময়ের জন্য হলেও পদ্মের সৌন্দর্যে সোনাকান্ত বিল এখন স্থানীয় মানুষের কাছে একটি নান্দনিক দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।’

বর্ষার পানি যতদিন থাকবে, ততদিনই হয়তো টিকে থাকবে এই পদ্মের রাজ্য। এরপর ধীরে ধীরে ফুল ঝরবে, পানি কমবে, আবার ফিরে আসবে চেনা কৃষিজমির রূপ। কিন্তু তার আগে সোনাকান্ত বিল যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য খুলে দিয়েছে এক ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের দুয়ার যেখানে জলের আয়নায় ভেসে ওঠে পদ্মের রং, আর বাতাসে মিশে থাকে গ্রামবাংলার চিরচেনা নির্মলতার সুবাস।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর