Sunday 23 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রংপুরে ৪ মরদেহ উদ্ধার: ডাকাতি নাকি পরিকল্পিত হত্যা?

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৩ আগস্ট ২০২৬ ১২:৩৪ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ ১৩:২২

নিহত গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী। ছবি: সংগৃহীত

রংপুর: মহানগরের কামালকাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকায় একটি তালাবদ্ধ বাসা থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী (১২)-র মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তিনদিন ধরে বন্ধ ছিল বাসার দরজা

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকে পরিবারটির সঙ্গে স্বজনদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। বাড়িটি তালাবদ্ধ ছিল এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী টানা তিনদিন বোনকে ফোন করার পরও না পেয়ে শনিবার রাতে বাসায় আসেন।

বিজ্ঞাপন

পূজা চক্রবর্তী জানান, তিনি প্রথমে বোন প্রীতিলতা, তারপর বোনের স্বামী গণপতি চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী ও ছেলে প্রীয়মের ফোনে কল করেন, কিন্তু সবার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বাসায় এসে তিনি তালাবদ্ধ দরজা ও ঘরের ভেতর এলোমেলো অবস্থা দেখে পুলিশকে খবর দেন।

মরদেহের অবস্থান ও হত্যাকাণ্ডের ধরণ

পুলিশ জানায়, গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামীর মরদেহ পাওয়া যায় ছাদের সিঁড়িতে। প্রীয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয় বিছানার নিচ থেকে, গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় ছাদের এক প্রান্তে।

রংপুর সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী জানান, ‘আপাতত আমরা যা দেখলাম, তাতে মনে হচ্ছে ডাকাতির ঘটনা। মনে হচ্ছে ৩-৪ দিন আগের ঘটনা। বাসার বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল বিচ্ছিন্ন। টাকাপয়সা যেখানে থাকে, সবকিছু ভেঙে ফেলা হয়েছে। গলায় রশি কিংবা গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।’

রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘তাদের খুন করা হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি। তাদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো রয়েছে। তাদের পুরো ঘরবাড়ি তছনছ অবস্থায় রয়েছে। আমরা ধারণা করছি, এটা ডাকাতি হতে পারে।’

স্বজনদের আহাজারি

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্বজনরা খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। পূজা চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ভাগনি আগামী ফোন দিয়েছিল, রাত ১টা-দেড়টার দিকে। এমনি কুশল বিনিময়। শনিবার আবার রাত পৌনে ৯টার দিকে ফোন দিয়েছি। আমার দিদির ফোনেও ফোন ঢোকে না, দুঃখিত বলে। জামাইবাবুর ফোনেও ফোন ঢোকে না। ভাগনির ফোনেও ফোন ঢোকে না। প্রিয়ম যে ক্লাস ফাইভে পড়ে ওর একটা বাটন ফোন আছে, সেটাতেও ফোন ঢোকে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ভাগনের মরদেহ ছিল খাটের নিচে। আমার বড় বোনকে সিঁড়িতে ফেলে রেখেছে। আমার বড় বোনের ওপর ভাগনিকে ফেলে রেখেছে। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। উনি জিলা স্কুলের একজন শিক্ষক ছিলেন। খুব ভালো মানুষ। অনেক কষ্ট করে এই বাড়িটা করেছেন। খুব শান্ত মানুষ। তাদের সবাইকে এভাবে মেরে ফেললো কারা। আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা কী! আমরা চাই, এর সুষ্ঠু বিচার হোক।’

গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাইয়ের স্ত্রী শেফালী চক্রবর্তী বলেন, ‘তাদের গ্রামের বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। তার শ্বশুরের নাম হেমন্ত চক্রবর্তী। এক বছর আগে গণপতি চক্রবর্তী অবসরে যান। তাদের পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান ছিলেন প্রীয়ম।’

গণপতি চক্রবর্তীর চাচাতো বোন মালতি চক্রবর্তী বলেন, ‘এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমরা খুনিদের বিচার চাই।’

তদন্ত চলছে

রংপুর কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের জানান, ধারণা করা হচ্ছে, দুই-তিন দিন আগে ওই হত্যার ঘটনা ঘটেছে। মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক ছিলেন। তিনি গত বছর ডিসেম্বর মাসে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পর তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা দিতেন। তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজের স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট, মহানগর পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। পুলিশ ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং অপরাধীদের শনাক্তে কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর