Friday 04 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রংপুরে ৬৬৯ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক

ডিস্ট্রিক্ট করেসপনডেন্ট
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:৪৭

রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস

রংপুর: জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলার ১ হাজার ৪৫৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৬৯টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে, যা মোট বিদ্যালয়ের প্রায় ৪৬ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে কার্যক্রম চালানো হলেও এতে পড়েছে স্থবিরতা।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৮টি উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে কাউনিয়া উপজেলার ১১৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫০টি, গঙ্গাচড়া উপজেলার ১৭৮টির মধ্যে ৬০টি, তারাগঞ্জ উপজেলার ৭৫টির মধ্যে ৫৬টি, পীরগঞ্জ উপজেলার ২৩৬টির মধ্যে ১২৫টি, পীরগাছা উপজেলার ১৭৮টির মধ্যে ৯৪টি, বদরগঞ্জ উপজেলার ১৭৬টির মধ্যে ১১০টি, মিঠাপুকুর উপজেলার ২৭৫টির মধ্যে ১৪৬টি এবং রংপুর সদর উপজেলার ২২২টির মধ্যে ২৮টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। সবচেয়ে বেশি সংকট মিঠাপুকুর উপজেলায়, যেখানে অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষকহীন।

বিজ্ঞাপন

মামলার জটিলতায় আটকে পদোন্নতি

রংপুরের পীরগাছা, মিঠাপুকুর, গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া উপজেলার শিক্ষকরা জানিয়েছেন, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জাতীয়করণ করা শিক্ষকদের একাংশ নিজেদের জ্যেষ্ঠতা দাবি করে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির দাবিতে মামলা করেছিলেন। এই মামলার কারণেই কয়েক বছর ধরে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া আটকে ছিল।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছেন, ওই মামলার কারণেই দেশের ৩২ হাজার সহকারী শিক্ষকের পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মামলা সংক্রান্ত বিষয়টি সমাধান হওয়ার পরপরই সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে। সম্প্রতি আদালত মামলাটি খারিজ করে দিয়েছে এবং বর্তমানে দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য তালিকা পিএসসিতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম

প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তির নেতৃত্ব অন্য শিক্ষকেরা সহজভাবে গ্রহণ করছেন না। এতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজে সমন্বয়হীনতা তৈরি হচ্ছে এবং দাপ্তরিক কাজেও নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

মিঠাপুকুরের শিববাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, ‘২০২৫ সাল থেকে আমি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। সহকারী শিক্ষক হিসেবে আমাকে ক্লাসও নিতে হয়। আবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় বিদ্যালয়ের বাইরেও থাকতে হয়। শিক্ষক সংকটের কারণে ঠিকমতো ক্লাস নিতে না পারায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভারপ্রাপ্তের দায়িত্বে থাকলেও আমি সহকারী শিক্ষক হওয়ায় অনেক সময় অন্য শিক্ষকরা নির্দেশনা মানতে গড়িমসি করেন। এই সম দ্রুত সমাধান দরকার।’

শিক্ষার্থী উপস্থিতি কমেছে, ঝরে পড়ছে অনেকে

মিঠাপুকুরের আমাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও কয়েক বছর ধরে প্রধান শিক্ষক নেই। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলা বিদ্যালয়টিতে খাতাকলমে শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিববাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিদ্যালয়ের শিক্ষকসংখ্যা আরও একজন কমেছে। শিক্ষক সংকটের কারণে চাইলেও ঠিকমতো ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও কমে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হওয়ায় উপজেলার অনেক শিক্ষক হতাশ হয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অন্যান্য পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন।’

শিক্ষক সমিতির নেতাদের অভিযোগ

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির মিঠাপুকুর উপজেলা শাখার সভাপতি ও ইমাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক পদে কোনো সার্কুলার নেই। এর মধ্যে অনেকে অবসরে যাওয়ায় শূন্য পদ আরও বেড়েছে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সহকারী শিক্ষকরা যথাযথ নির্দেশনা পাচ্ছেন না।’

শিক্ষক নেতারা মনে করছেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়গুলোতে নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে। ফলে এসব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পাঠদানেও প্রভাব পড়ছে।

যা বলছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা

রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে ডেপুটেশনের মাধ্যমে আমরা কাজ চালাচ্ছি। তারপরও স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকেরা একদিকে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে তাদের সহকারী শিক্ষকের পদটিও সংরক্ষিত রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চলতি দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য তালিকা পিএসসিতে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছি। মামলা খারিজ হওয়ায় এখন এই পথ উন্মুক্ত হয়েছে। আশা করি, শিগগিরই প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।’

এ ছাড়া রংপুর জেলায় ৩৮৭ জন সহকারী শিক্ষক নির্বাচিত হয়ে পদায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। আগামী ১ অক্টোবর তারা যোগদান করলে শিক্ষক সংকট কিছুটা কমবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর