ঢাকা: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি, অসামান্য আত্মত্যাগ ও গৌরবময় ইতিহাস সংরক্ষণে নির্মিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ আজ বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) থেকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হচ্ছে।
এর আগে বুধবার (৫ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তবে উদ্বোধনের দিনে এটি কেবল আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদ পরিবারের সদস্যদের পরিদর্শনের জন্য রাখা হয়েছিল।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ১৭ একর এলাকাজুড়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনকে রূপান্তর করে গড়ে তোলা এই জাদুঘরে প্রবেশ করতে আগ্রহীদের অনলাইনে আবেদন করে আগে থেকেই টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। টিকিটের মূল্যের ক্ষেত্রে দেশি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য টিকিটের দাম ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য বিদেশি নাগরিকদের জন্য দুই হাজার টাকা ধার্য করা হয়েছে।
তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, আজ বৃহস্পতিবার থেকে সাধারণ দর্শনার্থীরা ‘জুলাই ৩৬’ ওয়েবসাইটে গিয়ে নিবন্ধনের মাধ্যমে সুবিধাজনক টাইম-স্লট ও টিকিট বেছে নিয়ে পরিদর্শনের সুযোগ পাবেন। পুরো জাদুঘর প্রাঙ্গণ প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা রাখা হবে। তবে মূল ভবনের ভেতরে অতিরিক্ত ভিড় এড়ানো এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক দর্শনার্থীর জন্য তিনটি সময়ভিত্তিক স্লট নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিদিন মূল ভবনে মোট ৯০০ জন দর্শনার্থী প্রবেশের অনুমতি পাবেন, যেখানে প্রতিটি স্লটে সর্বোচ্চ ৩০০ জন করে প্রবেশের সুযোগ থাকবে। এর মধ্যে প্রথম বা মর্নিং স্লট বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা, দ্বিতীয় বা মিড ডে স্লট দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৩টা এবং তৃতীয় বা ইভিনিং স্লট বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বহাল থাকবে।
অনলাইন ওয়েবসাইটের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিপুল সাড়ার কারণে আগামী ৯ আগস্ট পর্যন্ত সবকটি স্লটের টিকিট এরই মধ্যে বুকিং হয়ে গেছে এবং দর্শনার্থীরা আগামী ১০ আগস্ট থেকে পুনরায় নতুন স্লটের টিকিট কাটার সুযোগ পাবেন।
গণভবনের ঐতিহাসিক প্রতিটি অবকাঠামো ও স্মারক অক্ষত রেখেই এই বিশেষ জাদুঘরটি গড়ে তোলা হয়েছে। জাদুঘরের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই লাল ইটের পথের দুই পাশে নানা রকম ফলজ গাছ দেখা যাবে, যার পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে ‘গণতন্ত্রের পথে দীর্ঘ যাত্রা’ শীর্ষক এক বিশেষ প্রদর্শনী। এখানে দেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত রাজনৈতিক ইতিহাসের নানাবিধ ঘটনাপ্রবাহ ধারাবাহিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
প্রধান ফটকের ঠিক দক্ষিণ পাশে সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত বৃত্তাকার স্মৃতিস্তম্ভ ‘জুলাই মেমোরিয়াল’ তৈরি করা হয়েছে, যার গায়ে গণঅভ্যুত্থানে শহিদ হওয়া ব্যক্তিদের নাম উৎকীর্ণ রয়েছে এবং ভেতরের অংশটি তৈরি করা হয়েছে একটি প্রতীকী কবরস্থানের আদলে। তা ছাড়া খোলা প্রাঙ্গণের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনের ঐতিহাসিক ও মর্মান্তিক সব ঘটনাকে কেন্দ্র করে একাধিক প্রতীকী ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে রিকশায় গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির করুণ দৃশ্য, সাঁজোয়া যানে ঝুলন্ত আন্দোলনকারীর রূপায়ণ এবং সাইকেলে মিছিলে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর প্রতিলিপি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পাশাপাশি পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা, গুমের অভিযোগ, বিভিন্ন অভিযান এবং নারী আন্দোলনকারীদের সাহসিকতার স্মরণে পৃথক ভাস্কর্য সংযোজন করা হয়েছে।
জাদুঘরের দক্ষিণ প্রান্তে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের বিতর্কিত ‘আয়নাঘর’-এর আদলে একটি প্রতীকী গোপন বন্দিশালা কক্ষ তৈরি করা হয়েছে, যা দর্শনার্থীদের ভয়াবহ পরিবেশের অভিজ্ঞতা দেবে। দোতলা মূল ভবনের নিচতলায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, আলোকচিত্র, ধারণকৃত ভিডিও, প্রামাণ্য উপকরণ ও সাবেক বাসভবনের ব্যবহৃত ঐতিহাসিক সামগ্রী সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। সেখানকার একটি বিশাল কক্ষে গোলক আকৃতির ডিজিটাল ডিসপ্লে স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রামাণ্য চিত্র ও নানা ভিডিও ফুটেজ নিয়মিত প্রদর্শিত হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ক্ষতিগ্রস্ত বৈঠক কক্ষ বা ‘কল রুম’ যেভাবে গণঅভ্যুত্থানের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেভাবেই কাচ দিয়ে ঢেকে সংরক্ষণ করা হয়েছে যেন দর্শনার্থীরা কাচের ওপর দিয়ে হেঁটে সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে পারেন।
ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্থান পেয়েছে জুলাই আন্দোলনের শত শত শহিদের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত জামাকাপড়, বই-খাতা, খেলার সামগ্রী এবং শহিদ আবু ইসাহাকের রক্তমাখা পোশাক। দ্বিতীয় তলায় দিনভিত্তিক আন্দোলনের নানা ঘটনাপ্রবাহের চিত্র প্রদর্শনীসহ ‘ইমার্সিভ প্রজেক্ট’ নামের একটি বিশেষ ৩৬০ ডিগ্রি প্রযুক্তির ডিজিটাল কক্ষ রয়েছে। মূল ভবন দেখার পর দর্শনার্থীরা খোলা প্রাঙ্গণ, শান্ত পুকুরপাড় ও ক্যাফেটেরিয়ায় সময় কাটাতে পারবেন এবং কাউন্টার থেকেও নির্ধারিত টিকিট সংগ্রহেরও সুযোগ থাকছে।