Saturday 08 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে ত্রুটিপূর্ণ ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: রাজউক চেয়ারম্যান

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৮ আগস্ট ২০২৬ ১৪:৫০

আলোচনা সভায় রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম

ঢাকা: ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে রাজধানীর ভবনগুলোর ত্রুটি চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম।

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত ‘ভূমিকম্প ঝুঁকিতে দেশ: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা জানান।

রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়ার প্রধান কারণ শুধু ভবনের উচ্চতা নয়। ত্রুটিপূর্ণ নকশা, মাটির অবস্থা এবং নির্মাণে অনিয়মও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। তাই ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ, মাটি পরীক্ষা এবং প্রকৌশলগত মান নিশ্চিত করা জরুরি।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক ভবন থাকায় একসঙ্গে সব ভবনের ঝুঁকি নিরূপণ করা সম্ভব নয়। এজন্য ধাপে ধাপে র‌্যাপিড ভিজ্যুয়াল অ্যাসেসমেন্ট, প্রিলিমিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট এবং ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

ভূমিকম্প মোকাবিলায় রাজউকের সক্ষমতা বাড়াতে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর মাধ্যমে ভূমিকম্পের আগে ঝুঁকি নিরূপণ, জনসচেতনতা তৈরি এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় গবেষণা করা হবে।

ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমানোর দায়িত্ব শুধু রাজউকের নয়। সিটি করপোরেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কার্যকর সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা থাকলে নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কাজ আরও সহজ ও সমন্বিতভাবে করা সম্ভব।’

ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনুমোদিত ছয়তলা ভবনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১০ তলা করা কিংবা অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করে নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হবে না। এ ধরনের ভবনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আইনি যাচাই ছাড়া অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই।’

নকশা প্রণয়নকারী স্থপতি ও প্রকৌশলীদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘শুধু নকশায় স্বাক্ষর করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নির্মাণকাজের বাস্তবায়ন ও তদারকিতেও তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। অনিয়ম হলে তাদেরও আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

ভবন মালিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করতে হবে এবং নির্মাণ শেষে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নিতে হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনিয়মের অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে রাজউক।’

রাজউক চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘রাজউকের দুর্বল উপস্থিতিকে শক্তিশালী উপস্থিতিতে পরিণত করাই তার লক্ষ্য। এ জন্য ভবন নির্মাণে অনিয়ম, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা ও নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এই কাজ একদিনে সম্ভব নয়। শুরু করেছি, কতটুকু করতে পারব জানি না; তবে আমরা চেষ্টা করছি।’

আলোচনা সভায় রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ভবন নির্মাণের ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে নিয়মিত ভূমিকা রাখতে হবে। প্রকৌশলী ও তদারকি সংস্থাগুলোকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।’

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘ভূমিকম্পের ঝুঁকি শুধু ভবনের নকশা বা নির্মাণমানের ওপর নির্ভর করে না; ভবনটি কোথায় এবং কী ধরনের মাটির ওপর নির্মিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল ও জলাভূমি এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।’

তিনি দুর্বল মাটির ওপর ভবন নির্মাণ বন্ধে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ‘ঢাকায় অনুমোদিত ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনুমোদিত ভবনের বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা ভবনগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’

তিনি ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি সারা বছর গণমাধ্যমে ভূমিকম্প নিয়ে জনসচেতনতামূলক সংবাদ প্রচারের ওপর গুরুত্ব দেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক সালেহ উদ্দিন বলেন, ‘ভূমিকম্প মোকাবিলায় কোনো একক সংস্থার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। সমন্বিতভাবে সব স্টেকহোল্ডারকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এ জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।’

তিনি জানান, ভূমিকম্পের পর দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঢাকার আশপাশের ৪১টি ফায়ার স্টেশনকে এয়ারমার্ক করা হয়েছে এবং বিশেষ রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে এসব প্রস্তুতি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

সালেহ উদ্দিন বলেন, ‘ভূমিকম্পে মানুষ সরাসরি মারা যায় না; মূলত ভবন ও স্থাপনা ধসে পড়েই প্রাণহানি ঘটে। তাই ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) ও সংশ্লিষ্ট আইন মেনে চলার পাশাপাশি ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করতে হবে।’

অনুষ্ঠানে ডুরার সভাপতি শাহজাহান মোল্লা বলেন, ‘ঢাকাসহ সারাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সঠিক তথ্য তুলে ধরে সরকার ও রাজউকের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমেও গণমাধ্যম সহযোগিতা করতে পারে।’

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডুরার সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম।

এ সময় ডুরার প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিরাজ মাহবুব ইফতি, সিনিয়র সাংবাদিক রিপন তালুকদারসহ সংগঠনটির অন্যান্য সদস্য ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর