চট্টগ্রাম: সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও সক্রিয় অংশগ্রহণই একটি পরিচ্ছন্ন, ডেঙ্গুমুক্ত, সবুজ ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ে তোলার মূল শক্তি বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়, এটি একটি জীবনাচরণ। তাই প্রতি শনিবার নিজের বাসা, ছাদ, আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি পরিবার ও বিদ্যালয় থেকেই শুরু করতে হবে।
‘পরিচ্ছন্ন শহর, সবুজ নগর; প্রফুল্ল মন, সুস্থ জীবন’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে এবং একটি সুন্দর ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শনিবার (২৫ জুলাই) জেলাব্যাপী ৩৩০০-এরও অধিক সরকারি ভবনের ছাদ ও আঙিনায় একযোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়েছে। এ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে মেয়র এ কথা বলেন।

সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণ থেকে এক বর্ণাঢ্য র্যালির মাধ্যমে দিনব্যাপী এই কর্মসূচির সূচনা হয়। র্যালিটি সার্কিট হাউজ থেকে শুরু হয়ে কাজির দেউড়ি, চট্টগ্রাম অফিসার্স ক্লাব এবং রেডিসন ব্লু প্রদক্ষিণ করে পুনরায় সার্কিট হাউজে এসে শেষ হয়।
পরবর্তীতে কোর্ট হিলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আঙিনা থেকে শুরু করে আইনজীবী ভবন হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদ পর্যন্ত সরাসরি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
ওই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি (অতিরিক্ত আইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মো. মনিরুজ্জামান, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম (বিপিএম)-সহ জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
এসময় মেয়র বলেন, একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয় ব্যক্তি ও পরিবার থেকে। তাই প্রতিটি নাগরিক যদি সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজের বাসা, আঙিনা, ছাদ ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তোলেন, তাহলে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর নগর গড়ে তোলা অনেক সহজ হবে। তিনি বলেন, সরকারি সংস্থার একার পক্ষে নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়; এ জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ।

তিনি জানান, পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস শিশুদের মধ্যে গড়ে তুলতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্কুলগুলোতে ‘স্কুল হেলথ স্কিম’ চালু করা হয়েছে। এর আওতায় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার অভ্যাস তৈরি এবং পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘চট্টগ্রামকে একটি নান্দনিক জেলায় রূপান্তরের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন আজকে ২৫শে জুলাই সারা জেলাব্যাপী এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানে জেলা প্রশাসনের সাথে মাননীয় মেয়র মহোদয়, সিডিএ চেয়ারম্যান মহোদয়, বিভাগীয় কমিশনার স্যার, আমাদের সকল ডিআইজি মহোদয়, পুলিশ কমিশনার মহোদয় ও এসপি মহোদয়সহ সকল দফতরের সরকারি কর্মকর্তারা একত্রিত হয়েছেন।’
অভিযানের বিস্তৃতি ও কৌশলগত রূপরেখা তুলে ধরে তিনি জানান, এ পর্যন্ত জেলাতে মোট ১৩১টি দপ্তরের ৪১৬টি ভবন, ৮টি আবাসিক এলাকার ১০৮টি ভবন, ৪০৬টি উপজেলা লেভেলের ভবন এবং ২২৯৫টি স্কুলে এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ভবনগুলোর ছাদ ও আঙিনায় এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম মাসব্যাপী চলবে। আমরা প্রতিদিন এবং প্রতি শনিবার কি পরিমাণে ময়লা সেখান থেকে আসলো ও কালেক্ট করা হলো, সেই তথ্যসহ ভবনের আগের ও পরের চিত্র সংগ্রহ করছি। সেভাবেই কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।’
পরিচ্ছন্নতার মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে জাহিদুল ইসলাম মিঞা জোর দেন সুস্থ মানসিকতা ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সরকার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, সুস্থ চিন্তার জন্য সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন প্রয়োজন। কিন্তু পরিবেশ যদি অস্বস্তিকর বা অসুস্থ থাকে, সেখানে সুস্থ চিন্তা কিংবা সুস্থ শরীর কোনোটাই সম্ভব নয়। তাই আগামী প্রজন্মের জন্য একটা সুস্থ বাংলাদেশ ও সমাজ গঠনে আমরা এই কার্যক্রম শুরু করেছি।
জনসাধারণের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আমরা কারো ওপর চাপ সৃষ্টি করে বা জোরপূর্বক এটি করাতে চাই না; বরং পরিচ্ছন্নতাকে একটি স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত করতে চাই। বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের যুগে বিশ্বমঞ্চে পরিবর্তনশীল নতুন বাংলাদেশকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন হিসেবে তুলে ধরাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরিচ্ছন্নতার এই ধারা বজায় রাখতে মাসব্যাপী মনিটরিং ব্যবস্থা চালু থাকবে।