চট্টগ্রাম: বিদেশগামী নাগরিকদের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার নামে প্রতারণা, সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে সনদ তৈরি এবং নকল ওয়েবসাইট ও কিউআর কোড ব্যবহার করে প্রতারণা করা হত। এ অভিযোগে এক সংঘবদ্ধ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।
সোমবার (১৭ আগস্ট) এই বিষয়ে গণমাধ্যমকে জেলা পুলিশ বিস্তারিত তথ্য জানায়।
জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) ও জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) যৌথ অভিযানে বাঁশখালী ও চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে রোববার (১৬ আগস্ট) গভীর রাতে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন মো. আশরাফ আলী খান (৩৬), মো. নিশান (৩৬), মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন (৪৮) ও মো. আবদুর রহমান (৪৬)।
পুলিশ জানায়, বিদেশগামী এক ব্যক্তির পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে চক্রটির কার্যক্রমের সন্ধান পাওয়া যায়। সহজে ও অল্প সময়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে চক্রের সদস্যরা ওই ব্যক্তির কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নেন।
পরে সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে প্রকৃত পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের আদলে একটি জাল সনদ তৈরি করা হয়। প্রতারণাকে বিশ্বাসযোগ্য করতে প্রকৃত পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের কিউআর কোডের আদলে নকল কিউআর কোড এবং একটি নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে চক্রটি।
পুলিশের ভাষ্য, ওই কিউআর কোড স্ক্যান করে সনদ যাচাই করা হলে প্রকৃত সরকারি ওয়েবসাইটের পরিবর্তে চক্রটির তৈরি নকল ওয়েবসাইটে তথ্য প্রদর্শিত হতো। ফলে জাল সনদটিকে আসল বলে মনে করার সুযোগ তৈরি হয়। চক্রটির তৈরি জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্সটি প্রকৃত মনে করে সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সিতে জমা দেন ভুক্তভোগী। পরে ট্রাভেল এজেন্সির যাচাইয়ে সেটি জাল হিসেবে শনাক্ত হয়। এরপর বিষয়টি জানিয়ে চট্টগ্রাম পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় জেলা গোয়েন্দা শাখা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, পারস্পরিক যোগাযোগ, অর্থ লেনদেন এবং ব্যবহৃত প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হয়।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় অল্প সময়ের মধ্যেই চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। পরে জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স তৈরি, নকল ওয়েবসাইট ও কিউআর কোড ব্যবহার এবং অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত চার সদস্যকে বাঁশখালী ও চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় এ ঘটনায় নিয়মিত মামলা করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, চক্রটির সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানিয়েছে, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি। বিদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে একজন বাংলাদেশি নাগরিকের আইনগত অবস্থার বিষয়ে এ নথি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে। সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে নথি তৈরি এবং সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে নকল ওয়েবসাইট ও কিউআর কোড ব্যবহার করা গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণাই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের সরকারি নথির বিশ্বাসযোগ্যতা ও দেশের ভাবমূর্তির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, সরকারি নথি জালিয়াতি, প্রযুক্তির অপব্যবহার, প্রতারণা ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। বিদেশগামী নাগরিকদের কোনো দালাল বা অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স না নিয়ে নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে জেলা পুলিশ।