বাকৃবি: খুলনায় একটি বেকারির কর্মচারীদের পিকনিকে রান্না করা গরুর মাংস অস্বাভাবিকভাবে সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। ঘটনার পর অনেকেই বিষক্রিয়া বা ইচ্ছাকৃত ভেজালের আশঙ্কা প্রকাশ করলেও, মাংস বিজ্ঞান ও খাদ্য রসায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে বলে মত দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এনিম্যাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ মিট সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ড. মো. আবুল হাশেম।
বুধবার (২৯ জুলাই) এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।
অধ্যাপক ড. আবুল হাশেম বলেন, আমার মতে এ ধরনের রঙ পরিবর্তনের মূল কারণ মাংসের ভেতরের মায়োগ্লোবিন প্রোটিন ও এর পরফাইরিন বা হিম রিংয়ের রাসায়নিক পরিবর্তন। বাইরে থেকে রং বা রাসায়নিক মেশানোর প্রয়োজন হয় না। মায়োগ্লোবিনের কেন্দ্রে থাকা আয়রনের জারণ অবস্থা এবং তার সঙ্গে যুক্ত লিগ্যান্ডের ধরনের ওপর মাংসের রঙ নির্ভর করে।
তিনি জানান, জবাইয়ের পর পরফাইরিন রিং-এর ফ্রি বাইন্ডিং সাইটে কোনো মৌল যুক্ত না থাকলে একে মায়োগ্লোবিন বা ডিঅক্সিমায়োগ্লোবিন বা রিডিউসড মায়োগ্লোবিন বলে। এই সময় কেন্দ্রে আয়রন ফেরাস অবস্থায় থাকে এবং মাংস বেগুনি-লাল দেখায়। বাতাসের সংস্পর্শে এলে অক্সিমায়োগ্লোবিন তৈরি হয়ে মাংস উজ্জ্বল লাল হয়ে ওঠে যা আমরা তাজা মাংসের রঙ বলে চিনি।
তিনি আরও বলেন, উজ্জ্বল লাল বর্ণ অবস্থায় ফ্রি বাইন্ডিং সাইডে অক্সিজেন যুক্ত হবে এবং আয়রন ফেরাস অবস্থাতেই থাকবে। এই উজ্জ্বল রঙ দুই থেকে তিন ঘন্টা স্থায়ী থাকে এরপর ধীরে ধীরে বাদামি বর্ণ ধারণ করতে থাকে। এই অবস্থায় পরফাইরিন রিংয়ের ফ্রি বাইন্ডিং সাইটে পানি যুক্ত হয় এবং ফেরাস আয়ন ফেরিক আয়নে রূপান্তরিত হয় যাকে রাসায়নিকভাবে মেটমায়োগ্লোবিন বলে। এসব মাংসের স্বাভাবিক পরিবর্তন। কিন্তু পচনশীল বা অনুপযুক্তভাবে সংরক্ষিত মাংসে Pseudomonas, Shewanella putrefaciens এবং কিছু Lactobacillus প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া সালফারযুক্ত অ্যামিনো অ্যাসিড ভেঙে হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S) উৎপন্ন করে এবং হাইড্রোজেন সালফাইড থেকে সালফার পরফাইরিন রিংয়ের ফ্রি বাইন্ডিং সাইটের সাথে যুক্ত হয় সালফোমায়োগ্লোবিন তৈরি করে এবং এই অবস্থায় মাংস সবুজ রঙ ধারণ করে। রান্না করলে এই সবুজ রঙ আরও গাঢ় হয়।
অধ্যাপক ড. হাশেমের মতে, দ্বিতীয় সম্ভাব্য কারণ হলো কোলেগ্লোবিন বা ভার্ডোহিম গঠন। হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড অথবা জারিত লিপিডের প্রভাবে এ পরিবর্তন ঘটে। Leuconostoc ও Weissella গোত্রের ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া পারঅক্সাইড উৎপন্ন করে, যা পরফাইরিন রিংকে জারিত করে সবুজ রঞ্জক সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের ফলে লিপিড অক্সিডেশন হলেও অনুরূপ পরিবর্তন ঘটতে পারে এবং তখন মাংসে র্যান্সিড (rancid) গন্ধও সৃষ্টি হয়।
তৃতীয় ও চতুর্থ কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, এগুলো সাধারণত প্রসেসড বা কিউরড মাংসের ক্ষেত্রে দেখা যায়। অতিরিক্ত নাইট্রাইট ব্যবহারের ফলে নাইট্রোসিল জাতীয় সবুজ রঞ্জক তৈরি হতে পারে, যা আন্তর্জাতিকভাবে ‘নাইট্রাইট বার্ন’ নামে পরিচিত। এটি পচনের লক্ষণ নয়, বরং কিউরিং প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতার ফল। অন্যদিকে, তীব্র জারণের চূড়ান্ত পর্যায়ে পরফাইরিন রিং সম্পূর্ণ ভেঙে বিলিভার্ডিন সদৃশ বাইল জাতীয় পিগমেন্ট তৈরি হয়, ফলে সবুজ রঙ স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
খুলনার ঘটনা প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. মো. আবুল হাশেম মনে করেন, প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাখ্যাই সবচেয়ে যৌক্তিক।
তিনি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী কসাই আগের দিন গরু জবাই করে সাধারণ রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করেছিলেন এবং পরদিন তা বিক্রি করেন। যথাযথ কোল্ড চেইন বজায় না থাকলে অথবা দীর্ঘ সময় জীবাণু বৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশে মাংস রাখা হলে রান্নার আগেই ব্যাকটেরিয়াজনিত H₂S উৎপাদন কিংবা লিপিড অক্সিডেশন শুরু হতে পারে। রান্নার সময় জীবাণু ধ্বংস হয়ে গেলেও তাদের সৃষ্ট রাসায়নিক পরিবর্তন থেকে যায় এবং তখনই সবুজ বর্ণ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়। তাই রান্না করা মাংসে জীবিত জীবাণু না পাওয়া গেলেও সেটি নিরাপদ ছিল এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই ধারণা করেছিলেন বেকারিতে ব্যবহৃত কোনো রাসায়নিক বা মসলা মাংসের রঙ পরিবর্তনের জন্য দায়ী। কিন্তু এ ঘটনায় তরকারির ঝোল স্বাভাবিক লাল রঙের ছিল, পরিবর্তন দেখা গেছে শুধু মাংসের টুকরোগুলোতে। এই পর্যবেক্ষণ বাইরের কোনো রাসায়নিকের পরিবর্তে মাংসের অভ্যন্তরের হিম রঞ্জকের রাসায়নিক পরিবর্তনের ব্যাখ্যাকেই বেশি সমর্থন করে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নমুনাভিত্তিক পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ অপরিহার্য।
জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি বলেন, সালফমায়োগ্লোবিন বা কোলেগ্লোবিনজনিত সবুজ বর্ণ সাধারণত জীবাণুজনিত পচনের ইঙ্গিত বহন করে। তাই এ ধরনের মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকাই উচিত। যদিও কিউরড মাংসে নাইট্রাইটজনিত সবুজ বর্ণ সবসময় পচনের নির্দেশক নয়, তবুও উৎস নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তা গ্রহণ করা নিরাপদ নয়। সন্দেহজনক রঙের মাংস ফেলে দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
তিনি আরও বলেন, রান্না করা মাংসে সবুজ বর্ণের মূল কারণ হলো পরফাইরিন রিংয়ের রাসায়নিক পরিবর্তন যা ব্যাকটেরিয়াজাত H₂S, পারঅক্সাইড, লিপিড অক্সিডেশন অথবা অতিরিক্ত নাইট্রাইটের কারণে ঘটতে পারে। এ প্রক্রিয়া সাধারণত রান্নার আগেই শুরু হয় এবং রান্নার ফলে তা আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে জনস্বার্থে নিজের মতামত তুলে ধরে অধ্যাপক হাশেম বলেন, জবাইয়ের পর থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো কোল্ড চেইন সঠিকভাবে বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। দ্রুত শীতলীকরণ, উপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ এবং মানসম্মত ভ্যাকুয়াম প্যাকেজিং নিশ্চিত করা গেলে জীবাণুর বৃদ্ধি ও লিপিড অক্সিডেশন উভয়ই কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং খুচরা পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতি নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা পরিবহনের সময় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে মাংস বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও এর ভেতরে রাসায়নিক পরিবর্তন শুরু হতে পারে যা অনেক সময় রান্নার পর স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।