ইবি: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদেরকে ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ১৬ জন শিক্ষার্থী বিভাগীয় সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—ময়লা পানি মুখে নিয়ে আটকে রাখা, সামনাসামনি দাঁড় করিয়ে ১০ ধরনের হাসি দিতে বাধ্য করা, বারবার পরিচয় দিতে বাধ্য করা, অশ্লীল বাক্য বলিয়ে ভিডিও ধারণ, জোর করে নাচানো, রাত পর্যন্ত ক্যাম্পাসে আটকে রাখা, বিভিন্ন স্থাপনার সামনে গিয়ে ছবি তুলে আনা এবং নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনের ছাদে উঠে ছবি ও ভিডিও ধারণের নির্দেশ দেওয়া ইত্যাদী। সবচেয়ে গুরুতর যে অভিযোগটি উঠেছে সেটি হলো, এক নারী শিক্ষার্থীকে সিনিয়রদের কথা না শুনলে ‘রেপ হলে কী করবা’ বলে হুমকি দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী, বিভাগের ওরিয়েন্টেশনের দুই দিন পর থেকেই শুরু হয় কথিত ‘ম্যানার শেখানো’। ক্লাস শেষে ছেলে-মেয়ে সবাইকে কক্ষে বসিয়ে রাখা হতো। সেখানে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘ফরমাল পরিচয়’ শেখানোর নামে নবীনদের আটকে রাখতেন। একপর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীকে ৭০ থেকে ৮০ বার পর্যন্ত পরিচয় দিতে বাধ্য করা হতো। পরিচয়ে সামান্য ভুল হলেই গালিগালাজ, অপমান ও মানসিক চাপ দেওয়া হতো। দুপুরে ক্লাস শেষ হলেও অনেক দিন বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার আগে শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরতে পারতেন না বলে অভিযোগ তাদের।
এরপর প্রতিদিন বিকেল ৫টার মধ্যে সবাইকে ফুটবল মাঠে উপস্থিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্লাস প্রতিনিধিকে (সিআর)। কেউ অনুপস্থিত থাকলে জবাবদিহি করতে হতো তাকে। প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন এভাবে চাপ প্রয়োগ করায় সিআর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে অভিযোগ। তৃতীয় ধাপে রাতের বেলায়ও তাদের ডাকা হতো। কখনো রাত সাড়ে ৮টা থেকে রাত ১২টা, আবার কখনো রাত ১টা বা দেড়টা পর্যন্ত বসিয়ে রাখা হয়েছে।
এসব ঘটনায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের সানি, নেহালী, সানাউল করিম, মেহেদী হাসান, রিয়াদ হাসান ও সজীব সবচেয়ে সক্রিয় ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে প্রীতম, হাসিব, সারা, নির্ঝরা ও ফাইজার উপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের নাহিদ এবং ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের কাইয়ুমের বিরুদ্ধেও নবীন ব্যাচের সিআরকে শাসানোর অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, এসব ঘটনার অভিযোগ তুলে নিতে এক ভুক্তভোগীকে চাপ প্রয়োগ ও নিজেকে ছাত্রদল আহ্বায়ক দাবি করেন ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আমীরুল অনি। এছাড়া, ভুক্তভোগী নবীন শিক্ষার্থীদের সহপাঠী জিসান এসব ঘটনায় সিনিয়রদের সহযোগিতা এবং ব্যাচমেটদেরকে অভিযোগ দিতে বাধা দেন বলে জানা গেছে।
এদিকে. কুষ্টিয়া শহরে অবস্থানরত এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের সানাউল করিম শহরে থাকা নবীনদের ডেকে পরিচয়পর্বের একপর্যায়ে একজনকে পুকুরের ময়লা পানি মুখে নিয়ে আটকে রাখতে বলেন। এ সময় আরেক শিক্ষার্থীকে তার সামনে দাঁড় করিয়ে ১০ ধরনের হাসি দিতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ। তিনি বলেন, ভুক্তভোগীরা একাধিকবার অস্বীকৃতি জানালেও শেষ পর্যন্ত তাদের জোর করে এসব করতে বাধ্য করা হয় বলে দাবি করেন। এক পর্যায়ে ওই শিক্ষার্থী মুখের পানি নাক দিয়ে বের করে ফেলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, ওরিয়েন্টেশনের পর প্রথম ক্লাসের দিন তাকে ও এক সহপাঠীকে বিবিএ ফ্যাকাল্টির ৬২৮ নম্বর সিটবিহীন একটি ফাঁকা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সেখানে তাদের আটকে রাখা হয়। এ সময় তাদের ৭০ থেকে ৮০ বার পরিচয় দিতে বাধ্য করা হয়। একজনকে জোর করে ছবি আঁকতে বলা হয়। ক্লাসরুমে পড়ে থাকা পানির বোতল ও কাগজের সঙ্গে গিয়ে পরিচয় দিতেও বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ। পরে অনুষদ ভবনের সামনে একটি চা-স্টলের পেছনে দাঁড় করিয়ে আরও মানসিক নির্যাতন করা হয়। এক পর্যায়ে ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে বের হয়ে এক বড় ভাইকে ফোন করলে ওই শিক্ষার্থীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে তার সঙ্গে থাকা অন্য শিক্ষার্থী তখনও আটকে ছিলেন বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় সানি নেহালী ও মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রীতম ও হাসিবও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, একই দিন রাত ৮টার দিকে তাদের আবার জিয়া মোড়ে ডাকা হয়। প্রথমে নয়জন উপস্থিত হলেও অন্যরা না আসায় ক্লাস প্রতিনিধিকে আধা ঘণ্টার মধ্যে সবাইকে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে যারা দেরিতে আসেন, তাদের বিভিন্ন ধরনের ‘শাস্তি’ দেওয়া হয়। দুজন লাইব্রেরির নাম ভুল বলায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে ১০ মিনিটের মধ্যে লাইব্রেরির সামনে গিয়ে ছবি তুলে আসতে বলা হয়। অন্য দুজনকে ডায়না চত্বরে গিয়ে ২০ মিনিটের মধ্যে ল্যাম্পপোস্ট গুনে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভুল জায়গার ল্যাম্পপোস্ট গুনে আসায় তাদের আবারও সেখানে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে অন্য এক শিক্ষার্থীকে পুরো বিষয়টির ভিডিও ধারণ করতে বলা হয়। এছাড়া ক্লাস প্রতিনিধি মেয়েদের হলের নাম ভুল বলায় তাকে প্রতিটি মেয়েদের হলের সামনে গিয়ে সেলফি তুলে আনতে বলা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এরপর ক্লাস প্রতিনিধি ও জিসান নামে আরেক শিক্ষার্থীকে জোর করে নাচানো হয়। রাত দেড়টার দিকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। এসব নির্দেশনায় সানি নেহালী, রিয়াদ, হাসিব, সানাউল করিম ও প্রীতম জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
ওই শিক্ষার্থীরা আরও জানান, পরবর্তীতে সিনিয়রদের ডাকে আর না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নবীন শিক্ষার্থীরা। এর ফলে টানা দুই দিন ১৭ জন শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত হননি। পরে ক্লাস প্রতিনিধিকে চাপ দিয়ে আবার সবাইকে ডেকে আনা হয়। একই দিন বিকেলে তাদের মুগ্ধ সরোবরে নিয়ে দুইদিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার কারণ জানতে চাওয়া হয়। এসময় এক শিক্ষার্থী দেরিতে পৌঁছালে তাকে ২০ মিনিটের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি অনুষদের সামনে গিয়ে ছবি তুলে আসতে বলা হয়। পাঁচ মিনিট বেশি সময় লাগায় তাকে ১৫ মিনিটের মধ্যে নির্মাণাধীন ১০ তলা কবি গোলাম মোস্তফা অ্যাকাডেমিক ভবনের ছাদে উঠে ছবি ও ভিডিও ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর দাবি, শারীরিকভাবে মোটা হওয়ায় ছাদে উঠতে গিয়ে তিনি হাঁপাতে থাকেন এবং একপর্যায়ে হার্ট অ্যাটাকের মতো অনুভূতি হয়। পরে কাজে ১০ মিনিট দেরি হওয়ায়, তাকে একটি ভিডিওতে অশ্লীল বাক্য বলতে এবং সেটি বিভাগের মেসেঞ্জারের কমন গ্রুপে শেয়ার করতে বলা হয়। একই নির্দেশ মিতুল নামে আরেক শিক্ষার্থীকেও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী শ্রীরামপুর ঘুরতে নিয়ে সেখানেও তাদেরকে (ছেলে-মেয়ে উভয়) আটক রেখে ম্যানার শেখানো হয় এবং বিভিন্ন মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। এ ঘটনায় সম্মুখ সারিতে ছিলেন ২০২৪-২৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী নির্ঝরা, সারা, রিয়াদ ও সানি নেহালী। এ ঘটনায়, এক নারী শিক্ষার্থীকে সিনিয়র ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে বলা হলে তিনি অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তীতে তাকে হুমকি দেওয়া হয় যে, ‘সিনিয়ররা ডাকলে দেখা করো না, কথা শোনো না, পরে রেপ হলে কী করবা।’
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, অভিযোগ জমা দেওয়ার আগে একজন শিক্ষার্থীকে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ফোন করে শাহ আজিজুর রহমান হলের ৩১৯ নম্বর কক্ষে একা যেতে বলেন সানি নেহালী। সেখানে বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আমিরুল অনি নিজেকে ছাত্রদলের আহ্বায়ক পরিচয় দিয়ে তাকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা রেখে বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, যেন তিনি কোনো অভিযোগ না দেন। তাদের কথা না শুনলে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জনিত সমস্যা হতে পারে বলেও তিনি জানান। ঘটনার পর ওই শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদল আহ্বায়ক মাসুদ রুমী মিথুনকে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি।
শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব রাফিজ আহমেদ বলেন, ‘আমাদের আহ্বায়ক তো একজনই (মিথুন)। সে সংগঠনের নাম ব্যবহার করে কোনো অপরাধ করলে আমরা তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবো। প্রমাণ পেলে শুধু সাংগঠনিক নয়, প্রশাসনিকভাবেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হবে।’
এ বিষয়ে বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ‘আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি নিয়ে বিভাগের সব শিক্ষক মিলে তদন্ত করে একটি রিপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘উপাচার্যের নির্দেশে উল্লেখ্য সব বিভাগের চেয়ারম্যানকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তারা তদন্ত করে জানাবেন র্যাগিং এর ঘটনা ঘটেছে কিনা। এছাড়া প্রত্যেক বিভাগে একজন শিক্ষকের র্যাগিং বিষয়ে দেখাশোনার নির্দেশনা দেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘ট্যুরিজম বিভাগের একটি রিপোর্ট আমাদের হাতে এসেছে। এ বিষয়ে আমরা এ সপ্তাহে মিটিংয়ে বসবো। অপরাধ প্রমাণিত হলে ছাত্রত্বও চলে যেতে পারে। আর নবীন শিক্ষার্থীদেরকে ‘পরিচয়পর্ব শেখানোর’ পদ্ধতি বন্ধ করা হবে। পরিচয় হতে হলে সেখানে বিভাগীয় সভাপতি অথবা শিক্ষক থাকতে হবে।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ‘র্যাগিং ইস্যুতে বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও ডিনদের কাছে নোটিশ পাঠানোর জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে।’