Saturday 22 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মানসিক চাপ ও একাকীত্ব / রাবিতে সাড়ে ৬ বছরে ১৬ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

রাবি করেসপন্ডেন্ট
২২ আগস্ট ২০২৬ ০৮:০২ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ ০৮:১৩

আত্মহত্যা। প্রতীকী ছবি

রাজশাহী: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে অন্তত ১৬ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা করেছেন। এসব ঘটনার অধিকাংশই ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বাইরে বিভিন্ন মেস, ছাত্রাবাস ও ভাড়া বাসায়।

সর্বশেষ গত ১০ জুন ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান আত্মহত্যা করেন। এ ছাড়া সম্প্রতি গণিত বিভাগের এক শিক্ষার্থী প্রকাশ্যে বিষাক্ত পদার্থ পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা প্রতিরোধ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও জনসংযোগ দফতরের তথ্য এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে গত কয়েক বছরে রাবির শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

একের পর এক অকাল মৃত্যু

  • ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফিরোজ কবীরের মরদেহ ক্যাম্পাসসংলগ্ন আমজাদের মোড় এলাকার একটি মেস থেকে উদ্ধার করা হয়। এরপর ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর পটুয়াখালীতে নিজ বাড়িতে মারা যান নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী দেবজ্যোতি বসাক পার্থ।
  • ২০২১ সালের ৩০ জানুয়ারি নগরীর মির্জাপুর এলাকার একটি আবাসিক ছাত্রী হোস্টেল থেকে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মোবাসসিরা তাহসিন ইরার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এসেছিল বলে সে সময় পুলিশ জানিয়েছিল।
  • একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ইমরুল কায়েস নিজ বাড়িতে আত্মহননের পথ বেছে নেন। ২০২২ সালে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে একাধিক শিক্ষার্থীর। ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ইশতিয়াক মাহমুদ পাঠান নিজ বাসায় আত্মহত্যা করেন। ৯ এপ্রিল প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সোহাগ খন্দকার নীলফামারীর সৈয়দপুরে নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন।
  • একই বছরের ১৩ মে ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাবাসসুম নিজ ঘরে আত্মহনন করেন। মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা ও বিষণ্নতার কথা লিখেছিলেন তিনি। ৬ জুন নাট্যকলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জান্নাতুল মাওয়া দিশার আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। একই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর বিয়ের তিন মাসের মাথায় অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছন্দা রায় আত্মহত্যা করেন।
  • ২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারি চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাইমা আরাবী ইভা অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরদিন ২০ জানুয়ারি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। একই বছরের ৮ জুন লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. তানভীর ইসলাম রিতুর মরদেহ বিনোদপুর এলাকার একটি মেস থেকে উদ্ধার করা হয়। তার পড়ার টেবিল থেকে একটি চিরকুট উদ্ধারের কথা জানা যায়।
  • ১০ সেপ্টেম্বর শহীদ শামসুজ্জোহা হলের একটি কক্ষ থেকে সমাজকর্ম বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফুয়াদ আল খতিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর পর ২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফিশারিজ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. সিফাতুল্লাহর মরদেহ ক্যাম্পাসসংলগ্ন মেহেরচণ্ডী এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধার করা হয়।
  • একই বছরের ১২ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন মির্জাপুর এলাকার একটি আবাসিক ভবন থেকে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সোনিয়া সুলতানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় তার কক্ষ থেকে কয়েকটি চিরকুট উদ্ধারের কথা জানানো হয়।
  • ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর বিনোদপুরের লেবুবাগান এলাকার একটি মেস থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী লামিসা নওরীন পুষ্পিতার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী জুবাইদা ইসলাম ইতি আত্মহত্যা করেন। মেহেরচণ্ডী এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
  • সর্বশেষ গত ১০ জুন ‘আয়েশা টাওয়ার’ নামের একটি ছাত্রাবাস থেকে ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমানের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে সেও আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।

অধিকাংশ ঘটনাই আবাসিক হলের বাইরে

আত্মহত্যার ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বড় একটি অংশ ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বাইরে। মেহেরচণ্ডী, মির্জাপুর, বিনোদপুর ও আমজাদের মোড় এলাকার বিভিন্ন মেস ও ছাত্রাবাসে এসব ঘটনা ঘটেছে। হলের বাইরে অবস্থান করায় শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন আচরণ, মানসিক পরিবর্তন কিংবা সংকট অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা সহপাঠীদের নজরের বাইরে থেকে যায়। ফলে সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।

মানসিক চাপ ও একাকীত্ব নিয়ে উদ্বেগ

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং একাকীত্বসহ বিভিন্ন বিষয় শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে। তবে আত্মহত্যার প্রতিটি ঘটনার পেছনে নির্দিষ্ট কারণ আলাদাভাবে তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব সারাবাংলাকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতার পেছনে সামাজিক, মানসিক ও আর্থিক বিভিন্ন কারণ জড়িত। প্রেম বা সম্পর্কজনিত টানাপোড়েন, পারিবারিক কলহ, আর্থিক সংকট, একাকিত্ব ও হতাশা থেকে অনেকের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের আত্মহত্যার ঘটনা দেখেও কেউ কেউ প্রভাবিত হতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘এই বয়সটা নিজেকে গড়ে তোলার সময়। তাই শিক্ষার্থীদের পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘসময় হতাশা বা বিষণ্ণতা অনুভব করলে দ্রুত মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মানসিকভাবে পাশে থাকার মতো মানুষ ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা আত্মহত্যার প্রবণতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের দাবি

এদিকে একাধিক শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যুতে ক্যাম্পাসে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগ ও আবাসিক হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হলের বাইরে মেস ও ছাত্রাবাসে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্যও সংকটকালীন সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘মেসে থাকা বা আবাসিক হলে থাকার সঙ্গে আত্মহত্যার সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি না। মেসে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে একা থাকায় সেখানে এমন ঘটনা ঘটতে পারে।’ তবে মূল কারণ হিসেবে মানসিক সমস্যা, হতাশা, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারা এবং সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্কজনিত টানাপোড়েনকে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সুস্থ মানসিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে খেলাধুলা, সহশিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন। মানসিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিভিন্ন সেলের মাধ্যমে কাউন্সেলিং দেওয়া হচ্ছে। প্রক্টর অফিসও বিষয়গুলো নিয়মিতভাবে দেখভাল করছে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর