কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১৩২ এ দাঁড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, কারণ ধসে পড়া ভবনের নিচে আরও অনেকে আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্যতম শক্তিশালী এ ভূমিকম্পে দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
দেশটির ভূতাত্ত্বিক সংস্থা জানিয়েছে, ৭.৪ মাত্রার এই ভূমিকম্পটি স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ৭:৩৪ মিনিটে চোকো প্রদেশের ১০৩ কিলোমিটার গভীরে আঘাত হানে। পশ্চিম কলম্বিয়া জুড়ে শত শত মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল এলাকা জুড়ে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়েছে।
দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল চোকো প্রদেশের সান জোসে দেল পালমার এলাকার কাছাকাছি। ওই এলাকায় মানুষের বসবাস বেশ কম। তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে কফি চাষের জন্য পরিচিত রিসারালদা প্রদেশে, বিশেষ করে দোসকেব্রাদাস এলাকায়। বড় শহর ক্যালিতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তবে সেখানকার প্রশাসন নতুন করে কোনো মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেনি।
স্থানীয় মেয়র লিওন ফাবিও মারিন মনকাডা বলেছেন, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল পালমার গ্রামের কাছে হওয়ায় যাতায়াতের রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অলৌকিকভাবে কোনো মৃত্যু বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
সোমবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কলম্বিয়ার রাজধানী শহরগুলো থেকে জানানো হয়েছে, ভূমিকম্পে ৪৮০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

কালি শহরে কয়েক ডজন ভবন ধসে পড়েছে। রয়টার্স
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার (৩৪ মাইল) দূরে অবস্থিত পেরেইরা শহরটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিবিসির যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, শহরের প্রধান চত্বর প্লাজা বলিভারে অন্তত একটি ভবন ধসে পড়ছে এবং যেখানে বহু মানুষ জড়ো হয়েছিল সেই খোলা জায়গায় ধ্বংসাবশেষ ও ধুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শহরের মেট্রোপলিটন এলাকায় অন্তত ৪০ জন নিহত এবং ৬৫টি ভবন ধসে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর মধ্যে ১৫টিতে মানুষ আটকা পড়েছে।
শহরের কিছু অংশে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোর ৫টা পর্যন্ত কারফিউ জারি রয়েছে।
পেরেইরা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কালি শহরে ৩২টি ভবন ধসে পড়েছে।
২৯ বছর বয়সী ড্যান কাটলার লন্ডনের বাসিন্দা, কিন্তু তিনি তার সঙ্গীদের সঙ্গে কলাম্বিয়ায় ভ্রমণে এসছেন এবং প্রায় দুই মাস ধরে এখানে আছেন। বর্তমানে তিনি কালি শহরে অবস্থান করছেন।
ভূমিকম্পে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমি এর আগে এমন কিছুর অভিজ্ঞতা লাভ করিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পায়জামা পরেই বাইরে ছুটে যাই। হোটেলের বড় কোনো কাঠামোগত ক্ষতি হয়নি, তবে দেয়ালে উপরিভাগে ফাটল ধরেছে এবং রঙ ও পলেস্তারা উঠে গেছে।’
ম্যানিজালেস, কুইবডো, মেডেলিন, চোকো এবং ভ্যালে দেল কওকা অঞ্চলে মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।
মানিজালেসে অন্তত দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।

রাজধানী বোগোটাতে ভূমিকম্পের পর বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। রয়টার্স
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মানিজালেসের একটি হোটেলের বাসিন্দা অ্যাঞ্জেলিকা আভিলা বলেন, ভূমিকম্প আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়।
তিনি বলেন, ‘সবাই চিৎকার করছিল… আমি পাশের ভবনগুলো থেকে ধুলো বের হতে দেখেছি, এবং দেয়াল থেকে ইট খসে পড়ছিল।’
মানিজালেসের বাসিন্দা সাংবাদিক ও আবহাওয়াবিদ লুইস ফেলিপে মলিনা ভূমিকম্পের সময় তার বাড়িতে ছিলেন। তার বাড়িটি ছিল কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে।
তিনি বলেন, পূর্ববর্তী ভূমিকম্পের কারণে শহরটিতে ‘ভূমিকম্প-প্রতিরোধী ভবন নির্মাণের অত্যন্ত কঠোর বিধিমালা’ রয়েছে — তাই তার ভবনটি এর প্রভাব প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছিল।
তিনি বিবিসি মুন্ডোকে বলেন, ‘আমার ৪৫০টি বই আছে এবং তাকের ওপর মাত্র কয়েকটি বই দাঁড়িয়ে ছিল। কাঁচ ভাঙার এবং মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। এটি একটি ভয়াবহ এবং আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা ছিল।’