চীন-নেপাল সীমান্তে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি হওয়া হ্রদটি উপচে পড়তে শুরু করেছে। এর ফলে, তিব্বত অংশে একটি জলবাঁধ ভেঙে গেছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা, উদ্ধারকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে এবং নিরাপদ স্থানে সরে যেতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
রয়টার্স একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে জানিয়েছে, বন্যাবিধ্বস্ত রাসুয়া জেলায় হেলিকপ্টার উদ্ধার অভিযান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এবং স্থানীয়দের একটি পাহাড়ের দিকে ছুটে যেতে দেখা গেছে, কারণ সেখানকার বাঁধ দেওয়া একটি হ্রদ উপচে পড়তে শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছে।
চীনের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি নিউজ গত এক ঘণ্টায় বুধবারের ভূমিধসের পর সৃষ্ট প্রতিবন্ধক হ্রদটির স্থানাঙ্ক প্রকাশ করেছে।
সিসিটিভি নিউজ জানিয়েছে, হ্রদটি জিরং বন্দর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার (ছয় মাইল) দূরে অবস্থিত এবং এতে বিশ লাখ ঘনমিটারেরও বেশি পানি রয়েছে।
এর আগে, হ্রদটি ফেটে গিয়ে আরও বন্যার আশঙ্কায় চীনা কর্তৃপক্ষ আজ শুক্রবার সকালে তিব্বতে উদ্ধার অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।
নেপাল ও চীন উভয়ই বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) হিমালয়ে নতুন করে বন্যার ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছে। কারণ সেখানে উজানে ধ্বংসাবশেষের বাঁধের কারণে সৃষ্ট হ্রদটি ধসে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।
বুধবার (২৬ আগস্ট) আকস্মিক বন্যায় শত শত মানুষ নিহত হওয়ার পর, চীন তার তিব্বত অঞ্চলকে নেপালের সঙ্গে সংযোগকারী দুর্যোগ-কবলিত সীমান্ত ক্রসিংয়ে আরও বন্যার ঝুঁকি কমাতে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছিল।

স্যাটেলাইট চিত্রে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ফলে প্রতিবন্ধক হ্রদ তৈরি হওয়ার আগের অবস্থা। রয়টার্স
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হ্রদ উপচে পড়ার ঝুঁকি এবং পর্বত ধস ও তুষার ধসের মতো সম্ভাব্য দ্বিতীয় পর্যায়ের দুর্যোগের আশঙ্কায় সমস্ত চীনা উদ্ধারকর্মী ও যানবাহনকে একটি নিরাপদ এলাকায় সরে গিয়ে অপেক্ষারত রাখা হয়েছে। শুক্রবার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিসিটিভি এ কথা জানিয়েছে।
নেপালের কর্তৃপক্ষ পরবর্তী ৯০ মিনিটের জন্য উদ্ধার অভিযান স্থগিত রেখেছে বলে এক সেনা কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন।
হ্রদটির জলাধারে জলের পরিমাণ ২৫ লাখ ঘনমিটার ছাড়িয়ে গেছে। অথচ একদিন আগে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণের জন্য পাঠানো আট সদস্যের একটি চীনা প্রকৌশলী দল জানিয়েছিল হ্রদটির পানির পরিমাণ ১৫-২০ লাখ ঘনমিটারের চেয়ে বেশি।
সিসিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার এই প্রতিবন্ধক হ্রদটির আকাশপথে জরিপ এবং থ্রিডি মডেলিং পরিচালনার জন্য প্রকৌশলী দলটিকে মোতায়েন করে।
প্রকৌশলীদের একজন, চেন হানশাও, বলেন যে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর অসুবিধাসহ আরও অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল।
চেন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিসিটিভিকে বলেন, ‘হিমবাহ ধসে হ্রদটি তৈরি হওয়ার পর এর তীর বরাবর অনেক বিচ্ছিন্ন ও খাড়া শৈলশিরা দেখা দিয়েছে। হ্রদটির ঝুঁকি কমানোর সাধারণ উপায় হলো বাঁধের নিচু অংশে একটি নিষ্কাশন প্রণালী খনন করা। পানি কত দ্রুত প্রবাহিত হবে এবং হ্রদটি কত দ্রুত ভরে উঠবে, তার ওপর ভিত্তি করে সেই প্রণালীর প্রস্থ ও গভীরতা গণনা করার প্রয়োজন ছিল।’

ভূমিধসের পর চীনের জিরং বন্দরের দিকে যাওয়ার একটি ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামত করছেন উদ্ধারকর্মীরা। ছবি: রয়টার্স।
তাদের জরিপের তথ্য থেকে জানা গেছে, হ্রদটি প্রায় ১৫০ মিটার দীর্ঘ এবং ৪০-৫০ মিটার গভীর।
জিরং সীমান্ত বন্দর এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা উজানের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের চারপাশের মাটি ও শিলাকে আলগা এবং অস্থিতিশীল করে তুলেছে। আগামী সপ্তাহজুড়ে এই বৃষ্টি অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস রয়েছে।
চীন বৃহস্পতিবার সতর্ক করে বলেছিল, আগামী তিন দিনে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে হ্রদটিতে ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি প্রবেশ করবে। যা প্রায় ১,২০০টি অলিম্পিক সুইমিং পুলের সমান। যা বাঁধ ভাঙার উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করবে এবং ১ সেপ্টেম্বরের কাছাকাছি সময়ে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিজিটিএন-এর দেখানো একটি চীনা উদ্ধারকারী দলের আকাশ থেকে ধারণ করা ফুটেজেএিই প্রতিবন্ধক হ্রদ তৈরি হওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে। এতে দেখা যায়, একটি অববাহিকায় বাদামী জলের স্রোত জমা হচ্ছে যার কোনো দৃশ্যমান নির্গমন পথ নেই। যা এরইমধ্যে ঝোপঝাড় ও গাছপালা ডুবিয়ে দিয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ ও পাথরের একটি প্রতিবন্ধকের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের মতে, সীমান্তের উভয় পাশে প্রায় ১,০০০ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩১টি দেশের ৫৪০ জন পর্যন্ত বিদেশী রয়েছেন।