ঢাকা: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশজুড়ে নিখোঁজ হওয়া ২৫১ জনের গুমের ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, সাক্ষ্য এবং ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজ কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর। এর আগে গুমের শিকার ৫৫ জনের পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে বৈঠক করেন।
আমিনুল ইসলাম বলেন, “গুমের ঘটনাগুলোকে তারা ‘ওয়াইড স্প্রেড ও সিস্টেম্যাটিক অ্যাটাক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ, এসব ঘটনার মধ্যে পারস্পরিক মিল রয়েছে এবং অনেক ঘটনায় একই ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, ‘গুমের শিকার ২৫১ জন, যারা এখন পর্যন্ত ফিরে আসেননি, তাদের পেছনে একই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা প্রায় ঘুরেফিরে পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে এসব ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করে তদন্ত করা হচ্ছে।’
গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা একে একে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিচ্ছেন জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।’ তবে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করার কোনো কারণ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘অপরাধীদের বন্ধু মনে করার কোনো কারণ নেই। তারা যেকোনো সময় আমাদের ছোবল মারতে পারেন। এটি মাথায় রেখেই আমরা কাজ করছি।’
আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, ‘গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত শুরু হওয়ার পর কিছু অভিযুক্তের তৎপরতা বেড়েছে। এ কারণে ন্যায়বিচারের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।’
ট্রাইব্যুনালে যাদের বিরুদ্ধে বিচার চলছে, তাদের গতিবিধির ওপর নজরদারি এবং গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘যাদের আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে বা যাদের কর্মকাণ্ড সন্দেহজনক মনে হচ্ছে, তাদের বিষয়ে নজর রাখা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের ভেতরে-বাইরে, আসামিদের আনা-নেওয়ার সময় এবং গুমের মামলায় সাক্ষ্য দেওয়া বা দিতে যাওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, গুমের মামলাগুলোর তদন্ত আগের তুলনায় আরও গতিশীল হয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের জবানবন্দি গ্রহণ ও অন্যান্য তদন্ত কার্যক্রমও চলছে।
গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা টার্গেটের শিকার হতে পারেন কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তদন্ত যাতে কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয় কিংবা কোনো ধরনের নাশকতা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা না যায়, সে বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে।’
সরকারের কাছে নতুন করে সহায়তা চাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও সতর্ক করা হয়েছে।’
কিছু আসামির গতিবিধি ও কর্মকাণ্ড সন্দেহজনক মনে হয়েছে জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘তাদের কাছে এমন কিছু গোপন তথ্য রয়েছে, যার ভিত্তিতে আশঙ্কা করা হচ্ছে— কেউ কেউ নাশকতা বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটানোর চেষ্টা করতে পারেন। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করেই তারা কাজ করছেন।‘
এদিকে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন প্রণয়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন আমিনুল ইসলাম। তার মতে, আইনটি কার্যকর হলে দেশে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলোর বিচার আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ‘গুমের সঙ্গে জড়িতরা অত্যন্ত শক্তিশালী ও দুষ্কৃতকারী। বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা যেমন সতর্ক আছি, তেমনি গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদেরও সতর্ক থাকার অনুরোধ করছি।’
গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করে দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
সম্ভাব্য নাশকতা বা ‘স্যাবোটাজ’ প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের ভেতরে ও বাইরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নজরদারিতে রাখা হয়েছে।’ সম্প্রতি একটি সংবাদ তাদের নজরে এসেছে বলেও জানান তিনি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘কেউ যদি ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি বা কোনো ধরনের অপতৎপরতার চেষ্টা করেন, তা তাদের জন্যই আত্মঘাতী হবে।’