ঢাকা: ৫০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রার্থীকে উত্তীর্ণ করার দাবি জানিয়েছেন পরীক্ষার্থীরা। তাদের মতে, লিখিত পরীক্ষায় বেশি সংখ্যক প্রার্থী উত্তীর্ণ করা হলে ক্যাডার ও নন-ক্যাডারের সব পদ পূরণ করা সহজ হবে। অন্যথায় আগের কয়েকটি বিসিএসের মতো বহু পদ শূন্য থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরীক্ষার্থীদের দাবি, বিগত কয়েকটি বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায় তুলনামূলক কম সংখ্যক প্রার্থীকে উত্তীর্ণ করায় চূড়ান্ত নিয়োগের সময় অনেক ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদ পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তাই ৫০তম বিসিএসে পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
জয়পুরহাটের পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, ‘৪১, ৪৩, ৪৪ ও ৪৬তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। সবশেষ ৫০তম বিসিএসেও অংশ নিয়েছি। প্রত্যেক বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায় খুব কম সংখ্যম প্রার্থীকে উত্তীর্ণ করা হয়। অথচ দেখা যায়, তার তিন ভাগের এক ভাগ চূড়ান্তভাবে নিয়োগ হয়। কোনো কোনো বিসিএসে দেখা গেছে, যত সংখ্যক ক্যাডার নেওয়ার কথা সেই কোটাই পুরণ হয় না; যেমন ৪৭তম বিসিএসে সেটাই ঘটেছে।’
নওগাঁর পরীক্ষার্থী রিমন মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) কেবল একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষ জনবল নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। এই নিয়োগব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ তাই শুধু পরীক্ষার্থীদের জন্য নয়, রাষ্ট্রের সুশাসন, জনসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ পরিকল্পনার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক ৪৭তম বিসিএসের ফলাফল বিশ্লেষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—লিখিত পরীক্ষায় অপেক্ষাকৃত কমসংখ্যক প্রার্থী উত্তীর্ণ করানো কি শেষ পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়? চূড়ান্ত ফলাফলে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থেকে যাওয়ার পর এই প্রশ্নের উত্তর নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।’
রিমন মাহমুদ আরও বলেন, ‘৪৭তম বিসিএসে মূল বিজ্ঞপ্তিতে ৩ হাজার ৪৮৭টি ক্যাডার পদ ছিল। পরে চাহিদা বাড়ায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৬৩টিতে। কিন্তু লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করা হয়েছিল ৩ হাজার ৬৩১ জনকে। পরে মৌখিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতার ঘাটতি এবং বিশেষায়িত ক্যাডারে পর্যাপ্ত উপযুক্ত প্রার্থী না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ১ হাজার ৩২০ জনকে ক্যাডারে সুপারিশ করা সম্ভব হয়।’ তার দাবি, এতে প্রায় ২ হাজার ৩৪৩টি ক্যাডার পদ পূরণ হয়নি।
এ ছাড়াও তিনি বলেন, ‘এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। লিখিত পরীক্ষায় অধিক সংখ্যক প্রার্থী উত্তীর্ণ করার অর্থ এই নয় যে কাউকে যোগ্যতার ছাড় দেওয়া হবে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রত্যেক প্রার্থীকে পরবর্তীতে মৌখিক পরীক্ষা, বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়ন, পুলিশ ভেরিফিকেশন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ধাপ অতিক্রম করেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পেতে হবে। অর্থাৎ লিখিত পরীক্ষায় বেশি প্রার্থী উত্তীর্ণ করা কেবল কমিশনের সামনে বৃহত্তর একটি মেধার ভাণ্ডার তৈরি করে, যাতে প্রতিটি পদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য প্রার্থী থেকে নির্বাচন করা সম্ভব হয়।’
সিরাজগঞ্জের পরীক্ষার্থী রোজিনা খাতুন বলেন, ‘৫০তম বিসিএসে বেশি সংখ্যক প্রার্থী উত্তীর্ণ হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। এই বিসিএসে ক্যাডার পদ ১ হাজার ৭৬০টি এবং নন-ক্যাডার (৯ম-১২তম গ্রেড) পদ প্রায় ৩৯৫টি। অর্থাৎ মোট পদ প্রায় ২ হাজার ১৫৫টি। অন্যদিকে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ১২ হাজার ৩৮৫ জন প্রার্থী। ফলে কমিশনের সামনে পর্যাপ্ত সংখ্যক পরীক্ষার্থী রয়েছে, যাদের মাঝ থেকে যোগ্যদের মৌখিক পরীক্ষার জন্য বাছাই করা সম্ভব। যদি মোট পদের প্রায় পাঁচ গুণ, অর্থাৎ প্রায় ১০ হাজার ৭৭৫ জনকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করা হয়, তাহলে প্রতিটি ক্যাডারে পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা বজায় থাকবে। মৌখিক পরীক্ষার পরও প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডারের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য প্রার্থী পাওয়া সহজ হবে। পাশাপাশি ক্যাডারে স্থান না পাওয়া যোগ্য প্রার্থীদের মাঝ থেকে নন-ক্যাডার পদেও দ্রুত নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে।’
তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়েও বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ দেখা যায় না। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে ১৬ জন সদস্য রয়েছেন। যদি প্রতিটি সদস্যের নেতৃত্বে একটি করে ভাইভা বোর্ড গঠিত হয় এবং প্রতিটি বোর্ড দৈনিক গড়ে ১৫ জন প্রার্থীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে, তাহলে প্রতিদিন প্রায় ২৪০ জনের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব। সে হিসেবে প্রায় ১০ হাজার ৭৭৫ জন প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হবে প্রায় ৪৫ কার্যদিবস।’
রোজিনা খাতুন আরও বলেন, ‘অবশ্যই, কতজনকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করা হবে—এটি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের নীতিগত ও সাংবিধানিক এখতিয়ার। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা, বর্তমান পদের সংখ্যা, লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রার্থীর সংখ্যা এবং কমিশনের বিদ্যমান সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে কমিশনের সভায় আলোচনা হয়েছে। প্রার্থীরাও পিএসসির সামনে এসে এর আগে আন্দোলন করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিতেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। কাজেই যা কিছু সিদ্ধান্ত আসবে, সবার মতামতের ভিত্তিতেই আসবে এবং প্রার্থীরাই উপকৃত হবেন। কোনো শুন্য পদই ফাঁকা রাখা হবে না মর্মে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নিয়োগ কার্যক্রম আরও দ্রুত কীভাবে করা যায়, সে বিষয়েও কমিশন চিন্তা করছে।’