ঢাকা: নীরবতার বুক চিরে হঠাৎ যদি কোনো ষড়যন্ত্রের নীল নকশা নেমে আসে, তবে কি থমকে যায় ইতিহাস? ২০২৪ সালের ২৮ জুলাইয়ের অন্ধকার রাতে পুরো দেশ যখন এক তীব্র উৎকণ্ঠায় আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই প্রপ্রাগান্ডার বিষাক্ত ফাঁদ পেতে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল এক প্রদীপ্ত গণজাগরণকে। গোয়েন্দা পুলিশের রিভলবারের ভয় আর কৃত্রিম ভুরিভোজের ক্যামেরাবাজির আড়ালে সাজানো হয়েছিল এক ভুয়া জবনিকা। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সেই অশুভ নাটকের চিত্রনাট্য রাজপথের উদ্দাম তরুণদের রক্তের তেজকে এক সেকেন্ডের জন্যও থামাতে পারেনি; কারণ ততক্ষণে রাজধানীর ঘরের দড়জা পেরিয়ে প্রতিবাদের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশের রাজপথে আর গ্রামের মেঠোপথে।
ভোরের থাবা ও জিম্মি রাজপথ
২৮ জুলাইয়ের সূর্য ওঠার আগেই রাজধানীর মিরপুরের এক নিভৃত বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয় আন্দোলনমুখী তরুণী নুসরাত তাবাসসুমকে। এর আগেই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের চার দেয়ালে বন্দি করা হয়েছিল আন্দোলনের অগ্রভাগের শক্তি নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও আবু বাকের মজুমদারকে। দেশজুড়ে চলছে তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি গণগ্রেফতার, কারফিউয়ের ভয়াল পরিবেশ আর ইন্টারনেট বন্ধের এক শ্বাসরুদ্ধকর বিচ্ছিন্নতা। রাষ্ট্রীয় যন্ত্র যখন ভেবেছিল মূল কাণ্ডারিদের ক্ষমতার শক্তিতে বন্দি করলেই ছাত্র-জনতার আন্দোলন নিভে ছাই হয়ে যাবে, ঠিক তখনই ডিবি কার্যালয় হয়ে ওঠে গভীর চক্রান্তের আখড়া। সারা দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে তখন শুধুই চাপা আশঙ্কা, কী হতে চলেছে এই অদম্য তরুণদের ভাগ্যে?
ডিবি কার্যালয়ে সাজানো নাটক
রাত তখন ঠিক নয়টা। টেলিভিশন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দায় হঠাৎ ভেসে ওঠে একটি অতি রহস্যময় ভিডিওচিত্র। ডিবি কার্যালয়ের বন্ধ ঘরে বসে বিষন্ন ও আতঙ্কিত মুখে আন্দোলন প্রত্যাহারের এক লিখিত বয়ান পাঠ করছেন ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম। পাশেই বসা গোয়েন্দা পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা, আর টেবিলজুড়ে খাবারের রাজকীয় আয়োজন তুলে ধরে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এক অদ্ভুত প্রচারণামূলক ছবি। তৎকালীন ডিবি প্রধানের সেই ‘খাতির-যত্ন’ ও ‘নিরাপত্তার’ গালগল্পকে দেশবাসী এক মুহূর্তের জন্যও সত্য বলে মেনে নেয়নি। চোখের কোণে জমে থাকা আতঙ্ক আর কাঁপাগলার যান্ত্রিক উচ্চারণে স্পষ্ট ধরা পড়ছিল – এ কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ঘোষণা নয়, বরং অস্ত্রের মুখে বন্দি রেখে আদায় করা এক সাজানো মিথ্যাচার।
দেয়ালের ক্যানভাসে বিপ্লবের বার্তা
যখন গোয়েন্দা কার্যালয়ের ভেতরে আন্দোলনের মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর অপচেষ্টা চলছিল, ঠিক তখনই রাজপথের মুক্ত তরুণেরা হাতে তুলে নেয় রঙের তুলি আর স্প্রে ক্যান। ফেনী শহরের তাকিয়া রোড থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে ফুটতে থাকে প্রতিরোধের আগুন। রক্তচক্ষু আর পুলিশের রক্তিন বাধা উপেক্ষা করে আঁকা হতে থাকে বীর শহিদ আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অমর প্রতিকৃতি। দেয়ালের বুকে খোদাই হয়ে যায় ’৩৬ শে জুলাই’, ‘ভয়ের দেয়াল ভাঙল’, ‘বিকল্প কে? আমি, তুমি, আমরা’ কিংবা ‘শিক্ষা-ছাত্রলীগ একসঙ্গে চলে না’-র মতো স্পর্ধিত সব বাক্য। তুলির একেকটি টানে ফুটে উঠছিল কোনো বন্দিশালার আদেশে এই দেশের ছাত্রসমাজ দমে যাওয়ার পাত্র নয়।
মায়াকান্না বনাম মুক্ত তারুণ্যের হুংকার
একদিকে গণভবনে বসে স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা নিহতদের পরিবারের সামনে দাঁড়িয়ে মায়াকান্নার ডালপালা মেলে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করছিলেন, অন্যদিকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১৪৭ জনের মৃত্যুর সরকারি হিসাব দিয়ে সত্য গোপনের খেলায় মেতেছিলেন। কিন্তু দেশের মানুষ জেনে গিয়েছিল আসল সত্য, ততক্ষণে ১০ দিন পর মোবাইল ইন্টারনেট চালু হতেই ছড়িয়ে পড়ে প্রতিরোধের দাবানল। ডিবি কার্যালয়ের বাইরে থাকা মুক্ত সমন্বয়ক মাহিন সরকার, আব্দুল কাদের ও আব্দুল হান্নান মাসউদের তরফ থেকে মধ্যরাতেই আসে স্পষ্ট বার্তা- ‘ডিবি কার্যালয় কোনোদিন ছাত্রদের সংবাদ সম্মেলনের জায়গা হতে পারে না; অস্ত্রের মুখে আদায় করা ঘোষণা আমরা মানি না।’ রাজধানীসহ গোটা দেশ জুড়ে সায়েন্স ল্যাব, প্রেস ক্লাব ও উত্তরায় একযোগে নতুন আন্দোলনের আগুন জ্বলে ওঠে।
শিকল দিয়ে বাঁধা যায়নি ঝড়
শৃঙ্খলের শিকল দিয়ে কি কখনো ঝড়ের গতিকে বেঁধে রাখা যায়? ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই রাতের সেই বন্দিশালার কুৎসিত চিত্রনাট্যকে ধুলিসাৎ করে দিয়েছিল যে তরুণ সমাজ, তারাই প্রমাণ করেছিল যে, স্বৈরাচারের বন্দুকের নল নয়, রক্তে কেনা মুক্তিকামী সাহসের জয়ই শেষ কথা; আর সেই সাহসের ফিনিক ফোটা আলোর পথ ধরেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার মুখে দাঁড়িয়েছিল একটি প্রতাপশালী একনায়কতন্ত্র।