সুনামগঞ্জের প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওর জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য স্বর্গরাজ্য। থৈ থৈ নীল জলরাশি, মেঘালয় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল-করচের বন আর আকাশে সাদা মেঘের ভেলা- সব মিলিয়ে এটি যেন এক রূপকথার রাজ্য। জেলার টাঙ্গুয়ার হাওর, নিলাদ্রি লেক, লাকমা ছড়া, শিমুল বাগান ও যাদুকাটা নদীসহ বেশ কয়েকটি পর্যটনস্পট ভ্রমণপিপাসুদের নজর কেড়েছে। আর সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন হাজার হাজার পর্যটকরা। এই হাওর এখন আর কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নয়, এটি হয়ে উঠেছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন চাবিকাঠি। হাউজবোট ও পর্যটনের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে এখানকার স্থানীয় অর্থনীতি।
বছরের অন্তত ছয় মাস এই হাওর থাকে পানিতে টইটম্বুর। আর শীতকালে এটি হয়ে ওঠে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। সেইসঙ্গে চাঙ্গা করে তুলছে স্থানীয় ও দূর-দূরান্তের মানুষের জীবিকা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি। কয়েক বছর আগেও হাওড়পাড়ের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস ছিল কেবল ধান চাষ ও মাছ ধরা। কিন্তু বর্ষাকালে যখন চারদিক পানিতে ডুবে যেত, তখন অধিকাংশ মানুষই বেকার হয়ে পড়তেন। পর্যটন ব্যবসার প্রসারে এখন সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। স্থানীয় ও বাইরের উদ্যোক্তারা এখানে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের রাত কাটানো, খাওয়া-দাওয়া এবং দৃষ্টিনন্দন জায়গাগুলো ঘুরে দেখানোর জন্য এখন আধুনিক ও বিলাসবহুল হাউসবোট বা ভাসমান বাড়ি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে হাওরে ছোট বড় মিলিয়ে অন্তত ৪০০ হাউজবোট চলাচল করছে। এই বিশাল কার্যক্রম স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। প্রতিটি বোটে চালক, সহকারী, বাবুর্চি ও গাইডসহ ৫ থেকে ১০ জন স্থানীয় লোকজনের কর্মসংস্থান হচ্ছে। স্থানীয়রা বোট তৈরি, মেরামত, হাউজবোটে ইলেকট্রিকসহ অন্যান্য কাজে নিয়োজিত হয়ে নিজের কর্মসংস্থানও করে নিচ্ছেন। সেইসঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অসংখ্য পরিবার আজ এই পর্যটন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া, হাওরে আসা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ থাকে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার, যেমন- হাওরের মিঠা পানির দেশীয় তাজা মাছ, হাঁসের মাংস, দেশি চালের ভাত, বিষমুক্ত সবজি ও দেশি মুরগিসহ টাটকা খাবার। ফলে স্থানীয় বাজারে কেনা-বেচা বহুগুণ বেড়েছে। জেলে, খামারি এবং সবজি বিক্রেতারা সরাসরি পর্যটকদের কাছে ভালো দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন।

হাওড়ের পানিতে পর্যটকদের অবগাহন। ছবি: সারাবাংলা।
এদিকে, সুনামগঞ্জ শহর কিংবা লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে পর্যটকদের তাহিরপুর বা সাহেববাজার বা আনোয়ার ঘাটে এবং মোহনগঞ্জ হয়ে মধ্যনগর ঘাটে পৌঁছানোর জন্য মোটরবাইক, সিএনজি, লেগুনা এবং ইজিবাইকের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। শত শত স্থানীয় যুবক এখন পর্যটক পরিবহনের মাধ্যমে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। এই কর্মযজ্ঞ ঘিরে হাওর এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা তৈরি হয়েছে পর্যটনকে ঘিরে।
তাহিরপুরের বাসিন্দা সুমন পারভেজ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা হাওড়পাড়ের মানুষ। আগে বর্ষা আইলে আমাদের কোনো কাম-কাজ থাকতো না। হয় অলস বইয়া থাকা লাগতো, না হয় ধার-দেনা কইরা সংসার চালাইতাম। অহন হাউসবোটে কাজ পাইয়া আল্লাহর রহমতে সারা বর্ষায় ভালো ইনকাম হয়। এখন পরিবার লইয়া শান্তিতে দিন কাটাইতাছি।’ শুধু সুমন-ই না, তার মত অসংখ্য যুবক ও মধ্যবয়সিদের ভাষ্য একই।
স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও জেলেরা সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগে হাওর থাইকা মাছ ধইরা পাইকারদের কাছে কম দামে বেইচা দিতে বাধ্য হইতাম। অহন পর্যটক ভাইরা আইসা সরাসরি আমদের কাছ থাইকা বড় আইড়, বোয়াল আর দেশি হাঁস ভালো দামে কিনা নেয়। আমাদের মতো সাধারণ জেলে ও খামারিদের জন্য পর্যটন এক বড় আশীর্বাদ। এছাড়া, হাউসবোটের কারণে আমাদের মুদি দোকানসহ অন্যান্য বেচা-বিক্রি বেড়েছে।’
হাউজবোটে একটি মাত্র ট্যুর প্যাকেজের মাধ্যমে পর্যটকরা হাওরের মূল জলাভূমির পাশাপাশি আশপাশের বহু ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক স্থান ভ্রমণের সুযোগ পান। এরমধ্যে রয়েছে – হাওরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াচটাওয়ার এলাকা এবং চারপাশের হিজল-করচের জলজ বন; টেকেরঘাটের চুনাপাথরের পরিত্যক্ত খনি, যা বর্তমানে নীলাভ পানির এক অপরূপ জলাধারে পরিণত হয়েছে এবং এখানকার ভারতের সীমান্তবর্তী আসা পানিতে লাকমা ছড়া যেন সিলেটের সাদা পাথরের রূপের স্বাদ দিবে; পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নিলাদ্রি লেকের সৌন্দর্য যেন আপনাকে নিয়ে যাবে নিউজিল্যান্ডে; যাদুকাটা নদী ও বারিক্কা টিলায় মেঘালয়ের পাহাড়ি ঝরনা থেকে নেমে আসা কাঁচের মতো স্বচ্ছ পানির নদী এবং সবুজ টিলা; এখানে এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম শিমুল বাগান বসন্তের পাশাপাশি বর্ষাতেও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

হাওড়ের জলে ডিঙি নৌকাও চলে। ছবি: সারাবাংলা।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক রাফসান আহমেদ এবং অন্যান্যরা সারাবাংলাকে জানান, ‘হাউজবোটের ছাদে বসে মেঘালয়ের পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ভাসতে ভাসতে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই জাদুকরী। প্রতিটি জায়গাগুলো অসাধারণ। তবে কিছু কিছু জায়গায় বোটে ব্যবহৃত ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক প্লেট ভাসতে দেখে খারাপ লেগেছে। সবাই যদি সচেতন হতো, তাহলে হাওরের পরিবেশটা আরও সুন্দর থাকত। আর হাওরে আসার সড়কপথ বেশি একটা ভালো না, যেকারণে আমাদের পর্যটকদের ভোগান্তি বেশি। ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ শহর হয়ে হাওরে আসা এবং ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ হয়ে মধ্যনগর দিয়ে হাওরে আসার ক্ষেত্রে প্রশাসনের আরো নজর দেওয়া দরকার।
হাউজবোট ওনার্স এসোসিয়েশন বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আরাফাত হোসাইন সারাবাংলাকে বলেন, একসময়ে হাওরে এক দীর্ঘ সময় পানিতে টইটম্বুর থাকার কারণে মানুষ বেকার থাকতো। কিন্তু হাউজবোটের কারণে এখানে পর্যটন ব্যবস্থা সহজ হয়েছে, বলা যায় হাওড় তার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এছাড়া, পর্যটন ব্যবস্থা শুরু হওয়ায় এখানের স্থানীয়রা অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারছেন। পানির মৌসুমে তারা আর বেকার থাকছেন না। কোনো কোনো উপায়ে হাউজবোট ও পর্যটন ব্যবস্থার কারণে স্থানীয়রা জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে স্থানীয় প্রশাসনকে এই দিকে আরও নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, অনেক সময় অনেক অসাদু মানুষের কারণে দূর থেকে আগত ব্যবসায়ীরা নানান সমস্যার সম্মুখীন হন। সেইসঙ্গে সড়ক ব্যবস্থা আরও উন্নত করা গেলে হাওরের এই পর্যটন ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাফওয়ান সারাবাংলাকে বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন খাতের দিকে সরকার আরও সু-দৃষ্টি দিলে এখান থেকেই জাতীয়ভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখা সম্ভব। হাওরে পর্যটন শুরু হওয়ার পর স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। আশা করছি হাওরে পর্যটনখাত আরো এগিয়ে যাবে।

হাওড়ে বেড়াতে আসা পর্যটকরা। ছবি: সারাবাংলা।
টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউজবোট পর্যটনের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে, এর মাধ্যমে হাওরাঞ্চলের মানুষের আর্থিক অবস্থা তথা অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবের বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান সারাবাংলাকে বলেন, আমাদের যে টাঙ্গুয়ার হাওর বা হাওরবেষ্টিত যে পর্যটন শিল্প আছে, সেটা ওখানের সাধারণ এলাকাবাসীর নাগরিক জীবনে অবশ্যই প্রভাব ফেলছে। সেটা উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা কাজ করছি। হাউজবোটগুলোতে পর্যটকদের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থাকছে। পর্যটকরা কিন্তু এখানে লোকাল খাবারগুলোই খাচ্ছে। তো সেই ক্ষেত্রে হাওরের মাছ, হাঁস, দেশি মুরগি, চাল, ডালসহ যা তৈজসপত্র- সবই কিন্তু লোকাল বাজার থেকেই হাউজবোট ওনার্সরা কিনতেছে। সেক্ষেত্রে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের একটা অবধারিত সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাছাড়া যে পর্যটন এলাকাগুলো আছে সেসব জায়গায় যখন লোকজন যায়, সেখান থেকেও লোকাল জিনিসপত্র কিনে পর্যটকরা। এটা অবশ্যই আমাদের লোকাল লোকদের ক্ষেত্রে পজিটিভ একটা সাইড।
সকড় পথের বেহাল অবস্থা দূর হলে পর্যটক আরও বাড়বে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা আসলে আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু করার চেষ্টা করতেছি, যাতে পর্যটন এরিয়া যেগুলো আছে সেখানে রাস্তার কাজগুলো ভালো হয়। এটা নিয়ে আমাদের জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটিতে নিয়মিত আলোচনা হয়। যাতে এলজিইডির যে রাস্তার অংশটুকু আছে, এলজিইডি যাতে সেটা সঠিকভাবে এবং সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করে। আমাদের ছয় লেনের যে রাস্তার কাজ হচ্ছে, এইটা আসলে বেশ কিছুদিন ধরেই ধীরগতিতে। এটা নিয়েও আমাদের মাসিক মিটিংগুলোতে আলোচনা হয় এবং আমরা এক্সেন মহোদয়কে সরাসরি একটা চিঠিও দিয়েছি যে, দ্রুততম সময়ে যেন কাজটা শেষ করতে পারেন। এছাড়া আরও কিছু এলজিইডির কাজ আছে। একটা বাধাঁঘাটি ব্রিজ আছে এলজিইডির, এটার কাজ অর্ধসমাপ্ত। এটা নিয়েও আমরা তাগিদ দিয়ে যাচ্ছি যাতে দ্রুত সমাপ্ত হয়। এছাড়া আমাদের উপজেলা পরিষদের অধীনে যে সকল রাস্তাঘাট আছে- তাদেরকেও আমরা জানিয়ে দিয়েছি, যাতে তারা এই সকল বিষয়ে প্রজেক্টগুলো নিতে পারে। অন্য প্রজেক্টের মাধ্যমেও এগুলো নিয়ে নিতে পারলে রাস্তাঘাট বা পরিবহনটা আরও সহজ হবে।’
বাইরের জেলাগুলো থেকে অনেকে এখানে এসে ব্যবসা করা হাউজবোটের মালিকরা স্থানীয় প্রভাবশালী বা অসাধু চক্রের মাধ্যমে ক্ষতির সম্মুখীন হন, তাদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বলেন, এই ধরনের কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। আমাদের হাউসবোট ওনার্স যারা আছে, তাদের সঙ্গে নিয়মিত মিটিং করি আমরা। এখন পর্যন্ত তারা এই ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে করে নাই। যদি এই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়, সত্যতা পাওয়া যায়- আমরা অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেব।