Thursday 13 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

তৃণমূল থেকে বঙ্গভবন / পরিশীলিত রাজনীতিক মির্জা ফখরুলের পথচলা

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১৩ আগস্ট ২০২৬ ২১:৫৩

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: তৃণমূলের রাজনীতি থেকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছাত্রনেতা, কর্মজীবনে শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তা, এরপর পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব— দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী হয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মনোনয়ন দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।

বিজ্ঞাপন

সর্বমহলে ‘সজ্জন রাজনীতিবিদ’ হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন শুরু থেকেই ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমী। ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও পেশাজীবনে তিনি শিক্ষকতা বেছে নিয়েছিলেন। পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী, পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য। তিনি এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভাতেও দায়িত্ব পালন করেন। মির্জা ফখরুলের মা মির্জা ফাতেমা আমিন।

শিক্ষাজীবনে মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন মির্জা ফখরুল। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি ছাত্রজীবনেই যুক্ত হন রাজনীতির সঙ্গে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় নেতৃত্বে ছিলেন।

শিক্ষাজীবন শেষে মির্জা ফখরুল শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে সরকারি চাকরিতেও যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন স্থায়ী হননি তিনি। ১৯৮৬ সালে চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তৃণমূল পর্যায়ের এই জনপ্রতিনিধিত্বের মধ্য দিয়েই তার রাজনৈতিক উত্থান নতুন গতি পায়।

এর পর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। পরে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে ধাপে ধাপে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন। বিএনপির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। বিএনপি সরকারে তিনি কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

দলের শীর্ষ নেতৃত্বেও ধীরে ধীরে তার অবস্থান সুদৃঢ় হয়। ২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন। এর পর থেকে দলটির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি।

বিএনপির দুঃসময়ে মির্জা ফখরুলের ভূমিকা তাকে দলের ভেতরে ও বাইরে আলাদা অবস্থান তৈরি করে দেয়। এক-এগারোর পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনে বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে দেশের রাজনীতির মাঠে দৃশ্যমান নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৮ সালে কারাগারে যাওয়ার পর এবং পরবর্তী সময়ে অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে দল পরিচালনা করেন। আর দেশের ভেতরে বিএনপির কর্মসূচি, আন্দোলন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মির্জা ফখরুল।

আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে নানা চাপ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি। বিএনপির প্রবীণ নেতাদের অনেকের মতে, দলের দুর্দিনে মির্জা ফখরুলের ভূমিকার জন্য তাকে সম্মানজনক দায়িত্ব দেওয়া স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত।

সংসদীয় রাজনীতিতেও তার রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হন। বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও বিএনপির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে বিএনপি তখন সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্ত্রী রাহাত আরা বেগম ও দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ মির্জা এবং মির্জা সাফারুহকে নিয়ে সংসারজীবন কাটাচ্ছেন। স্ত্রী রাহাত আরা বেগম একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শেষ করে অবসরে রয়েছেন। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা থেকে পৌর চেয়ারম্যান, সেখান থেকে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী—এরপর বিএনপির মহাসচিব। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবার রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন।

তৃণমূলের রাজনীতি দিয়ে যার পথচলা শুরু, সেই মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের গন্তব্য এখন বঙ্গভবন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তার মনোনয়ন সেই দীর্ঘ পথচলারই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর