Tuesday 18 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ফাঁসি দিবসে সূর্য সেনকে শ্রদ্ধায় স্মরণ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:৫৫ | আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:১১

সূর্য সেনের আবক্ষ ভাস্কর্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা। ছবি: সারাবাংলা

চট্টগ্রাম ব্যুরো: ৯২তম ফাঁসি দিবসে অগ্নিযুগের বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছে জন্মভূমি চট্টগ্রামের বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। এ সময় মাস্টারদার স্মৃতিবিজড়িত স্থান সংরক্ষণ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বিপ্লবীদের গৌরবজনক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান এসব সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

বৃহস্পতিবার (১২ জানুয়ারি) সকালে নগরীর জেএম সেন হল প্রাঙ্গণে সূর্য সেনের আবক্ষ ভাস্কর্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান সংগঠকরা।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) চট্টগ্রাম জেলার পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণের সময় কেন্দ্রীয় সদস্য মৃণাল চৌধুরী, জেলার সভাপতি অশোক সাহা, ফরিদুল ইসলাম, অজয় সেন, অমিতাভ সেন উপস্থিত ছিলেন। শ্রদ্ধা জানানোর পর সিপিবি নেতারা বিপ্লবীদের স্বপ্নের শোষণমুক্ত সমাজ ও দেশ গড়ার শপথ নেন।

বিজ্ঞাপন

এসময় সিপিবি নেতারা বলেন, ‘সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন। তিনি চট্টগ্রামকে স্বাধীন রেখেছিলেন। জীবন দিয়ে দেশবাসীর মনে স্বাধীনতার প্রবল স্পৃহা সৃষ্টি করেছিলেন। সেই লড়াইয়ের পথ ধরে বাঙালি নয় মাস যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার এতবছর পরও দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে যেন ছেলেখেলা চলছে। চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। বাঙালি জাতিকে আবার সাম্রাজ্যবাদের অধীনে নতজানু করার চেষ্টা চলছে। সূর্য সেনসহ বিপ্লবীদের আদর্শ নিয়ে লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে এসব চক্রান্ত প্রতিহত করতে হবে।’

বাসদের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানোর সময় চট্টগ্রাম জেলা শাখার ইনচার্জ ও চট্টগ্রাম-১১ আসনের প্রার্থী আল কাদেরী জয়, জেলা সদস্য হেলাল উদ্দিন কবির, আকরাম হোসেন, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের নেতা নাজিমুদ্দিন বাপ্পি, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম সদস্য সুপ্রীতি বড়ুয়া, নগর শাখা ছাত্রফ্রন্ট সভাপতি মিরাজ উদ্দিন, স্কুল বিষয়ক সম্পাদক উম্মে হাবিবা শ্রাবণী উপস্থিত ছিলেন।

এরপর বাসদ নেতারা বলেন, একটি স্বাধীন, মানবিক মর্যাদার ও গণতান্ত্রিক সমাজ, প্রতিষ্ঠা ছিলো সূর্য সেনের লড়াইয়ের মূলমন্ত্র। সেই স্বপ্ন বুকে ধারণ করে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় দেশ স্বাধীন হয়েছিল ।কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর আজও সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ৫৫ বছর ধরে ক্রমাগত বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠীর সীমাহীন দূর্নীতি, লুটপাট, গণবিরোধী কার্যকলাপের মাধ্যমে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আজ ধূলিসাৎ। সর্বশেষ ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষ আশা করেছিল বৈষম্য, শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু সে আশাও পূরণ হয়নি। এই বৈষম্য, শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা ও লুটপাটের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করতে মাস্টারদা সূর্য সেন অগ্নিযুগের বিপ্লবীরাই আমাদের চেতনা।’

বাসদ (মার্কসবাদী) ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর সময় চট্টগ্রাম জেলা সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম-৯ আসনের প্রার্থী শফি উদ্দিন কবির আবিদ, জেলা সদস্য ও চট্টগ্রাম -১০ আসনের প্রার্থী আসমা আক্তার, চট্টগ্রাম-১১ আসনের প্রার্থী দীপা মজুমদার, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট নগর শাখার সহসভাপতি পুষ্পিতা নাথ ও সাধারণ সম্পাদক নেভী দে এবং আবদুল্লাহ মুস্তাকিম উপস্থিত ছিলেন। দলটির নেতারা জেএম সেন হলে শ্রদ্ধা জানানোর পর চট্টগ্রাম জেলা কারাগারে সূর্যসেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির মঞ্চে স্থাপিত ম্যুরালেও শ্রদ্ধা জানান।

বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে সকালে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সিঞ্চন ভৌমিকের সভাপতিত্বে এতে বিভিন্ন বাম রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।

সভায় বক্তারা বলেন, ‘এদেশে হাত ধোয়া দিবসও পালন হয়। অথচ ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঐতিহাসিক দিনগুলোকে স্মরণ করা হয় না। স্বাধীনতার পর ৫৫ বছরে অনেক, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। কিছু হীন স্বার্থলোভী রাজনীতিবিদ যারা দেশ পরিচালনা করছে, তাদের উদাসীনতা ও আদর্শের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে রাষ্ট্র স্মরণ না করলেও যতদিন এ বাংলাদেশ থাকবে, বাংলার সংগ্রামী মানুষ থাকবে, সূর্য সেন ও তারকেশ্বর অন্যতম প্রেরণা হয়ে চির জাগরূক থাকবে।’

এদিকে চট্টগ্রাম জেলা ছাত্র ইউনিয়ন সকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সূর্যসেন হলের সামনে মাস্টারদার আবক্ষ ভাস্কর্যে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে। এ সময় কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দীন শুভ ও জেলা সভাপতি শুভ দেবনাথসহ নেতারা ছিলেন।

উল্লেখ্য, সূর্য সেন ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১৮ সালে শিক্ষাজীবন শেষ করে চট্টগ্রামে এসে গোপনে বিপ্লবী দলে যোগ দেন। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির (বিপ্লবীদের গঠিত সংগঠন) চট্টগ্রাম শাখার সর্বাধিনায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন বিপ্লবী বাহিনী নিয়ে বৃটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

বিপ্লবীরা দামপাড়া পুলিশ লাইন্স আক্রমণ করে অস্ত্রাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র লুট করে। মাস্টাররদা সেখানেই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করেন। এর পর তিনি পাহাড়ে আত্মগোপন করেন। সূর্য সেনকে ধরার জন্য ইংরেজ সরকার পুরস্কার ঘোষণা করে।

সরকার ১৯৩০ সালের ২৪ জুলাই চট্টগ্রামের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলার শুরু করে। ১৯৩২ সালের জুন মাসে মাস্টারদা প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্তকে ডিনামাইট দিয়ে চট্টগ্রাম কারাগার উড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। এই ঘটনায় ১১ জন বিপ্লবী গ্রেফতার হন। ২৪ সেপ্টেম্বর তারিখে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে সফল আক্রমণ চালান, তবে তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

এ ঘটনার পর মাস্টারদা পটিয়ার গৈড়লা গ্রামে আত্মগোপন করেন। কিন্তু ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি ধরা পড়েন। সূর্য সেন, তারকেশ্বর দস্তিদার এবং কল্পনা দত্তের বিশেষ আদালতে বিচার হয়। ১৪ আগস্ট সূর্যসেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির রায় হয় এবং কল্পনা দত্তের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়াারি চট্টগ্রাম কারাগারে তাদের ফাঁসি কার্যকর হয়।

সারাবাংলা/আরডি/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর