রাজশাহী: বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আঁতুড়ঘর। এই ক্যাম্পাসের রাজনীতি থেকে উঠে এসে জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিভিন্ন দলের বহু নেতা। তাই কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের আলোচনা এলেই স্বাভাবিকভাবেই নজর থাকে রাবির ছাত্ররাজনীতির দিকে। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। যেকোনো সময় ঘোষণা হতে পারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি। তবে সেই কমিটিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাদের মূল্যায়ন কতটা হবে, নাকি অতীতের মতোই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দৌড়ে তারা বঞ্চিত থাকবেন—এখন সেই প্রশ্নই সামনে আসছে বারবার।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। দলীয় সূত্র বলছে, কমিটি গঠনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি। তবে নতুন কমিটি ঘিরে সংগঠনের ভেতরে যেমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি রাবি ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও রয়েছে আলাদা আগ্রহ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, মামলা-হামলা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও যারা সংগঠনের সঙ্গে ছিলেন, এবার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তাদের কতটা জায়গা দেওয়া হবে—সেটিই হয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার অন্যতম বড় উদাহরণ অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। রাকসুর সাবেক এই ভিপি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার সময় থেকেই সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ছাত্রদলের গণ্ডি পেরিয়ে বিএনপির মূল রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন রিজভী। বর্তমানে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার রাজনৈতিক উত্থান রাবি ছাত্রদলের জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে যাওয়ার একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন নেতা। তাদের কেউ কেউ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাবি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন— এমন প্রায় আট/নয় জন নেতা বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন এবং বর্তমানে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ কারণে রাবি ছাত্রদলকে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাদের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উঠে আসার দৃষ্টান্ত শুধু ছাত্রদলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্যান্য ছাত্রসংগঠনেও রাবির সাবেক ও বর্তমান নেতাদের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পাওয়ার নজির রয়েছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক নেতা বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সংগঠনটির বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটিতেও রাবি শাখা থেকে পাঁচজন নেতা জায়গা পেয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে ছাত্রদলের ক্ষেত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশা ও আক্ষেপ—দুই-ই রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া বাম সংগঠনগুলোতেও মূল্যায়িত হয়েছে রাবি শাখার নেতারা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিকভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও রাবি শাখা ছাত্রদল কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। বিভিন্ন সময়ে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার ও হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। রাবি শাখা ছাত্রদলের একাধিক নেতা বলেন, এত দীর্ঘ সময় ধরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার পরও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রাবি ছাত্রদলের নেতাদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। তবে নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, এবার কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের সময় শুধু সাংগঠনিক পদ নয়, মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয়তা, ত্যাগ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হবে।
নতুন কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কারা জায়গা পেতে পারেন, তা নিয়ে এরই মধ্যে সংগঠনের ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্যদের তালিকায় রয়েছেন- রাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী, সাধারণ সম্পাদক সরদার জহুরুল ইসলাম, সিনিয়র সহসভাপতি সাকিলুর রহমান সোহাগ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু। এ ছাড়া আরও কয়েকজন নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। এ সকল নেতা ফ্যাসিবাদ আমলে জেল-জুলুম-নির্যাতন, হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন বলেন জানা গেছে।
সংগঠনের নেতাকর্মীদের একাংশ মনে করছেন, বর্তমান কমিটিতে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বিবেচনায় নেবেন সংগঠন। তবে কার ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় পদ জুটবে, তা নির্ভর করছে দলের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের ওপর।
রাবি শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি সাকিলুর রহমান সোহাগ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের রাবি ছাত্রদলের সংগ্রামী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পাওয়ার বিষয়ে আমরা খুবই আশাবাদী। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকেও আমরা এ বিষয়ে ইতিবাচক কিছু বক্তব্য পেয়েছি। আমরাও কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। আমরা আশাবাদী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের অন্তত এই শীর্ষ দুই নেতাকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবসময় ফ্যাসিবাদের বন্দুকের নলের ডগায় থেকেও রাজনীতি করে এসেছি। আশা করি, কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাদের সঙ্গে আমাদেরও সহাবস্থান নিশ্চিত হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, আমাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভূমিকা ও ত্যাগের বিষয়টি বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে।’
জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সরদার জহুরুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথম দিন থেকেই ছিলাম। ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমানের ডাকে রাজশাহী থেকে ঢাকায় আন্দোলনে গিয়ে জেল-জুলুমের শিকার হয়েছি। এমন কোনো জুলুম নির্যাতন নেই, যা আমাদের ওপর করা হয়নি। দলের হয়ে আরও কাজ করে যেতে চাই। সেদিক বিবেচনায় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদপত্যাশা থাকাটাই স্বাভাবিক।’
রাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিগত ১৭ বছর ধরে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেছি। যে সময়ে ছাত্রদল করার অপরাধে মানুষকে জীবন দিতে হতো, সে সময়ও আমরা দায়িত্ব পালন করেছি এবং সফলতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব সম্পন্ন করতে পেরেছি। আমাদের যে এজেন্ডা নিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল— খুনি হাসিনার পতনের আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করা— সেই আন্দোলনে আমরা শতভাগ সফল হয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, আন্দোলনের পরবর্তী সময়েও আমরা সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছি। এখন পর্যন্ত আমরা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ ধারণ করে রাজনীতি করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মানবিক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ গড়ার লক্ষ্যে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতার রাজনীতি করে যাচ্ছি। আশা করছি, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যে কমিটি গঠিত হবে, সেখানে রাবি শাখা ছাত্রদলের নেতাদের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা হবে এবং তাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।’