Tuesday 08 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি এক ‘আইকনিক’ উদ্যোগ

আসাদ জামান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৩০ মে ২০২৫ ১০:০০ | আপডেট: ৩০ মে ২০২৫ ১০:৩৪

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

জিয়াউর রহমান বিভিন্ন সংস্কারমুখী নীতি ও উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রেখে গেছেন। ক্ষমতাগ্রহণের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নানামুখী সংস্কারমূলক কাজ হাতে নেন এবং অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেন। জিয়াউর রহমান সমাজতান্ত্রের তাত্ত্বিক ধারণা থেকে সরে উদার ও বাস্তবমুখী অর্থনীতি ও শিল্পনীতির ধারণা দেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সকল নাগরিক সেবাকে সরকারি খাতে রেখে বেসরকারি শিল্প বিকাশের পথে কার্যকর উদ্যোগ নেন।

তৈরি পোশাক শিল্পের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক প্রবাসী শ্রমবাজার তৈরি করেন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি ‘একটি সন্তান হলে দুটি নয়, দুটি সন্তান হলে আর নয়, দুটি সন্তান সুখী পরিবার’ স্লোগানকে জনপ্রিয় করে তোলেন। ফলে দ্রুততার সঙ্গে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার একটা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা উন্নীত হয়।

বিজ্ঞাপন

এছাড়া জনশক্তি রফতানি, তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্পসহ সকল অপ্রচলিত পণ্যের রফতানির দ্বার উন্মোচিত করেন জিয়াউর রহমান। ফলে তার শাসনামলের মাঝের ও শেষ এই দুটি অর্থবছরে (১৯৭৭-৭৮ এবং ১৯৮০-৮১) বাংলাদেশ সাত শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়।

তার এতসব কর্মসূচির মধ্যে তাকে অমরত্ব দান করেছে খাল খনন কর্মসূচি। এ বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণের কাছে কিংবদন্তির মতো হয়ে আছে। জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারণ করলেই ১৯ দফা এবং খাল খনন কর্মসূচি সবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। খাল খনন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তিনি কেবল কৃষি ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধান করনে নি, বরং একটা সংস্কার বিপ্লবের গোড়াপত্তন করেছেন।

জিয়াউর রহমানের উন্নয়নমূলক প্রচেষ্টার মধ্যে খাল খনন কর্মসূচি একটি অবস্মরণীয় উদ্যোগ হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা সেচ ব্যবস্থাপনায় বিপ্লব এনে দিয়েছিল। সত্তর দশকের শেষ দিকে শুরু করা এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল খরা ও বন্যাজনিত সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা, যা দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের প্রধান দুটি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ খরা ও বন্যা উভয় দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদী এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ফলে অতিরিক্ত প্লাবন এবং শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানি সংকটের সৃষ্টি হয়। এই উভয় সংকটের কারণে ঐতিহাসিকভাবে মারাত্মক কৃষি ক্ষতি, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং জনবসতির স্থানান্তর ঘটেছে।

এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে জিয়াউর রহমান পানি সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনার একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হিসাবে খাল খনন কর্মসূচি হাতে নেন। তার এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল: ১. খাল খননের মাধ্যমে শুকনো মৌসুমে পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা, যা কৃষি কার্যক্রমের জন্য নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করবে, ২. খালের নেটওয়ার্ক ভারী বৃষ্টিপাতের সময় অতিরিক্ত পানি প্রবাহের চ্যানেল হিসেবে কাজ করবে, যা বন্যার ঝুঁকি কমাবে, ৩. খালগুলি মাটিতে পানি প্রবেশ সহজতর করবে, ফলে ভূগর্ভস্থ জলাশয়ের পুনঃপূরণ এবং সামগ্রিক পানির স্তরের উন্নতির পাশাপাশি ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দেশ রক্ষা পাবে।

জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাস্তবায়ন হয়, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় যেখানে কৃষি কার্যক্রম প্রাধান্য পায়। সরকার জনবল ও খনন যন্ত্রপাতিসহ সবধরনের আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র সরবরাহ করে, যা খনন ও পুনর্বাসন কাজে ব্যবহৃত হয়। স্থানীয় লোকদের খাল খনন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করা হয়। ফলে তাৎক্ষণিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

স্থানীয় কৃষক ও গ্রামবাসীরা খাল খনন প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করায় শ্রম ব্যয় কমার পাশাপাশি খালগুলি কার্যকরভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার উপযোগী রাখার দায়িত্বও তারা পালন করেন। নিজ হাতে খনন করা খাল নিজেরাই রক্ষার উদ্যোগ নেন প্রান্তিক কৃষক ও সাধারণ মানুষেরা। ফলে ৩০/৪০ বছর ওইসব খালে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকে, বেদখলের হাত থেকে রক্ষা পায়।

খাল খনন কর্মসূচিতে ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ও দেশজ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করা হয়, যা এটিকে ব্যয়সাশ্রয়ী ও টেকসই করে তোলে। খালগুলি কৌশলগতভাবে নদী, পুকুর এবং অন্যান্য জলাশয়ের সাথে সংযুক্ত করা হয়, যা একটি সমন্বিত জল ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা তৈরি করে।

খাল খনন কর্মসূচি বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে যুগান্তরকারী প্রভাব ফেলে। খাল একটি বহুমুখী নেটওয়ার্ক তৈরি করে। সেচ ব্যবস্থার পাশাপাশি কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে নৌপথ হিসেবেও ব্যবহার হয়। কাঁচাপাট পচানো এবং খালপাড়ে মৌসুমি সবজি চাষ, বড়ই, খেজুর, তাল, সুপারি, কলা, হলুদ, মরিচ চাষের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, যা কৃষকদের জীবন-জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া, আবহমান বাংলার সংস্কৃতিতে খাল এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

খালগুলো মৌসুমি বৃষ্টিপাতের সময় প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এটি আবাসিক ও কৃষি এলাকাগুলি থেকে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সরিয়ে নিয়ে বন্যার তীব্রতা ও প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। এটি শুধু জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করেই নয়, মাটির ক্ষয় এবং ফসলের ধ্বংসও হ্রাস করে। খালের উপস্থিতি পানির মাটিতে প্রবেশ সহজতর করে, যা ভূগর্ভস্থ জলাধার পুনরায় পূরণে সহায়তা করে এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর স্থিতিশীল করে।

এটি বিশেষ করে সেইসব এলাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যেগুলো পানীয় জল ও সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। খালগুলো বিভিন্ন জলজ প্রজাতির জন্য আবাস তৈরি করে, যা জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। খালপাড়ে গাছপালা বৃদ্ধি পেয়ে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রকে সহায়তা করে। জিয়াউর রহমান তার দূরদৃষ্টি দিয়ে বিষয়গুলি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তার খনন করা খাল এখনো গ্রামবাংলায় তার স্মৃতি বহন করে চলছে।

সারাবাংলা/এজেড/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

রাজকীয় স্বাদের ছানার কোপ্তা কারি
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:৫৪

আরো