Wednesday 16 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

চামড়া-বর্জ্যে মারাত্মক দূষণ, হালদায় মরছে ‘মা মাছ’

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
২৩ জুন ২০২৫ ০৮:০০

হালদায় মারা যাওয়া প্রজননক্ষম কাতলা মাছ। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম ব্যুরো: দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদী থেকে দুটি মৃত মাছ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে চারটি মৃত মাছ উদ্ধার হলো। প্রজনন সক্ষম এসব মাছকে ‘মা মাছ’ হিসেবে ডাকেন হালদা পাড়ের বাসিন্দারা।

গবেষকদের তথ্যানুযায়ী, সম্প্রতি হালদা নদীতে কোরবানির পশুর চামড়াসহ বর্জ্য ফেলার কারণে এরোমোনাস ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমিত হয়ে মাছগুলোর মৃত্যু হচ্ছে।

জানা গেছে, রোববার (২২ জুন) বিকেল ৫টার দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার রামদাস মুন্সীর হাট এলাকায় নদীতে ভেসে আসা মৃত মাছ দু’টি উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, রোববার সকালে একটি মৃত মা মাছ স্থানীয়রা উদ্ধার করে মাটিচাপা দেয়। এরপর বিকেলে আরও দুটি পাওয়া যায়। এর তিনদিন আগেও একটি মৃত মাছ উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। সর্বশেষ উদ্ধার হওয়া মৃত মাছ দু’টি পরীক্ষার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিচার্স ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ল্যাবরেটরির সংশ্লিষ্টরা জানান, বিকেলে উদ্ধার হওয়া মাছ দু’টি প্রজনন সক্ষম কাতলা মাছ। এর একটির দৈর্ঘ্য ৩৮ ইঞ্চি এবং ওজন ১২ কেজি ৮৫০ গ্রাম। মাছটি একেবারে পচে গেছে। অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে সেটির মৃত্যু হয়েছে বলে তাদের ধারণা। মৃত আরেকটি মাছের দৈর্ঘ্য ৩৬ ইঞ্চি এবং ওজন ৮ কেজি ৩৫০ গ্রাম। সেটি সদ্যমৃত বলে জানান ল্যাব কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিচার্স ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরিয়া। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘মৃত মাছ দুটি আমরা প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। মাছগুলোতে এরোমোনাস ব্যাকেরিয়ার সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এ ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে যখন মাছ দুর্বল অবস্থায় থাকে। আপনারা জানেন, মাসখানেক আগে গত ২৯ মে হালদা নদীতে মাছ ডিম ছেড়েছে। শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া অনুযায়ী এরপর মাছগুলো হরমোনজনিত নানা রোগে ভোগে এবং খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। আর এরোমোনাস ব্যাকেরিয়ার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলো দুর্বল মাছকে খুব সহজেই আক্রমণ করতে পারে।’

হালদায় মারা যাওয়া প্রজননক্ষম কাতলা মাছ। ছবি: সংগৃহীত

হালদায় মারা যাওয়া প্রজননক্ষম কাতলা মাছ। ছবি: সংগৃহীত

মাছগুলোতে এরোমোনাস সংক্রমণের বিভিন্ন লক্ষণ পাওয়া গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ত্বকে লাল ঘা, পাখনার গোড়া পচা, ফুলকা ফ্যাকাশে হয়ে পচন ধরা, পেট ও চোখ ফোলা- এসব উপসর্গ মাছগুলোতে দেখা গেছে। এতে আমরা মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছি যে, এরোমোনাস ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলে ব্রুড মাছগুলোর মৃত্যু হয়েছে।’

গবেষকরা জানিয়েছেন, গৃহস্থালি, কৃষি বা শিল্পের বর্জ্য মিশে কিংবা জৈব পদার্থের আধিক্যের কারণে পানি দূষিত হলে এরোমোনাস ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তার ঘটে।

প্রসঙ্গত, এ বছর ঈদুল আজহার পরের দিন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় হালদা নদীর সঙ্গে যুক্ত ‘তেরপারি’ নামে একটি শাখা খালে কোরবানির পশুর অবিক্রিত চামড়া এবং নাড়িভুঁড়িসহ আরও বর্জ্য ফেলেন স্থানীয়রা। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শ্রমিকদের মাধ্যমে প্রায় ৭০০ চামড়া তুলে মাটিতে পুঁতে ফেলেন। চামড়াগুলো পচে গিয়ে বর্জ্যে পরিণত হয়েছিল।

এ ঘটনার পর পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, চামড়া ব্যবসায়ীরা (মৌসুমি সংগ্রহকারী) ফটিকছড়ির নানুপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কোরবানির পর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু যথাযথ দাম না পেয়ে কেউ কেউ সেই চামড়া তেরপারি খালে ফেলে যান। সরাসরি তেরপারি খালে চামড়া ফেলার মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে হালদা নদী দূষণ করা হয়েছে। এতে নদীর কার্প (রুই) জাতীয় মাছ এবং উদ্ভিদসহ সব প্রাণির জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে। এ ঘটনায় পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে ফটিকছড়ি থানায় মামলা করা হয়।

অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঈদুল আজহার দুইদিন পর চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল। এতে আমরা ধারণা করেছিলাম, হয়তো দূষণের প্রভাব থাকবে না এবং মা মাছগুলো প্রাণে রক্ষা পাবে। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম, কোরবানির বর্জ্যে হালদা নদী দূষিত হয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। এ পর্যন্ত চারটি মাছের মৃত্যু আমরা নিশ্চিত হয়েছি। বাকিটা আল্লাহ জানেন।’

তিনি বলেন, ‘গতবছরও একই ঘটনা ঘটেছিল। কোরবানির ঈদের পর হালদা নদীতে সাতটি মা মাছ মারা যায়। ভবিষ্যতে হালদা নদীতে কেউ যাতে কোনো ধরনের বর্জ্য ফেলতে না পারে, এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’

সারাবাংলা/আরডি/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

রাজকীয় স্বাদের ছানার কোপ্তা কারি
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:৫৪

আরো