রংপুর: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বিকেল সাড়ে ৩টা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেওয়ার পর ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি চলছে। এদিকে, চলছে সরকারের ডাকা অনির্দিষ্টকালের কারফিউ। এদিন সকাল থেকেই কারফিউর মধ্যে রাজধানীর মতো উত্তরের জেলা রংপুরেও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। কিন্তু হঠাৎই খবর আসে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারত পালিয়েছেন। সেনাপ্রধানের ভাষণের অপেক্ষা না করে মুক্তির আনন্দে বেরিয়ে পড়ে দেশের অন্যান্য জেলার মতো রংপুরের সর্বস্তরের মানুষ। প্রতিটি গলির মুখ থেকে বের হয় খণ্ড খণ্ড মিছিল। ছোট্ট শিশু, স্কুল কলেজ ড্রেস পরা বালক-বালিকা থেকে শুরু চাকরিজীবী-মসজিদের ইমাম। কারো হাতে পতাকা, কারো কপালে পতাকা বাঁধা। একে একে সেই মিছিলে শরিক হচ্ছেন সবাই। গন্তব্য রাজপথ। সবার মুখে বিজয়ের স্লোগান বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!
সেদিন মিছিলের স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয় রংপুরের বিভিন্ন সড়ক। মিছিলের স্লোগানে ছিল, ‘জেগেছে রে জেগেছে, বাংলাদেশ জেগেছে’, ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘আমার ভাই মরল কেন, জবাব চাই, জবার চাই’, ‘৭১–এর হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’ প্রভৃতি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক দফার মুখে সেদিন স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবরে রংপুরের রাজপথে বিজয় উল্লাস করে ছাত্র-জনতা। বিকেল সাড়ে ৩টার পর থেকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন শহিদ আবু সাঈদ চত্বর, নগরীর শাপলা চত্বর, পায়রা চত্বর, লালবাগ চত্বর, পার্ক মোড়, মর্ডাণ মোড়, প্রেসক্লাব চত্বর, জাহাজ কোম্পানি মোড়, পায়রা চত্বর, টাউন হল চত্বর, জিলা স্কুল মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় আনন্দ মিছিল বের করে সাধারণ মানুষজন। প্রধান সড়কগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। বিভিন্ন এলাকা থেকে পৃথক মিছিল নিয়ে সড়কে ওঠেন ছাত্র-জনতা। এসব মিছিলে শিশু, ছাত্র-জনতাদের উল্লাস করতে দেখা যায়। এ সময় শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, যুবক, বৃদ্ধসহ সববয়সী মানুষের ঢল নামে পথে পথে।

বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন শহিদ আবু সাঈদ চত্বরে বিজয় উল্লাস করে ছাত্র-জনতা।
এছাড়া নগরীতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আনন্দ মিছিল নিয়ে বেরোবির প্রধান ফটকের সামনে শহিদ আবু সাঈদ চত্বরে পৌঁছান। সেখানে তারা বিজয় মিছিল করেন। তবে এসব আনন্দ উল্লাস চলাকালে নগরীতে কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি।
বিকেলের পর থেকেই মানুষের ঢলে পুরো রংপুর নগরী যেন ছাত্র-জনতার দখলে রয়েছে। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে রাজপথ মুখরিত করে রাখে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন সংগঠন ও তাদের অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও নগরীতে মিছিল বের হয়। বিভিন্ন স্থানে মিছিল থেকে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। কোথাও কোথাও শুকরিয়া আদায় দিতে নামাজও পড়েন ছাত্র-জনতা।

শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবরে রংপুরের রাজপথেই শুকরিয়া নামাজ পড়েন ছাত্র-জনতা।

খুশিতে শোকরানা নামাজ আদায়ের সময় সেজদায় লুটে পড়েন সবাই।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইদুজ্জামান বাপ্পী বলেন, ‘এ বিজয় দেশের জনসাধারণের। আমরা ছাত্ররা লাগাতার আন্দোলন করে আমাদের দাবি আদায় করেছি। এ বিজয়ে আমরা আনন্দিত। আমাদের আবু সাঈদ ভাইসহ শহিদ সকল ভাই-বোনের আত্মত্যাগের নজির এই জাতি মনে রাখবে।’
এদিকে, বিজয় মিছিলের স্লোগান থেকে রংপুরের রাজপথ প্রকম্পিত, তখন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ও রংপুর জেলা স্কুল মোড়ে শেখ মুজিবের ম্যুরাল ভাঙচুর করাসহ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভাঙচুর করে বিক্ষুদ্ধ জনতা।