সাতক্ষীরা: শহিদুল, আমজেদ, এবাদুল, আনিসুর। পেশায় ভ্যানচালক। তারা সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার মহেশ্বরকাটি এলাকার বাসিন্দা। প্রচন্ড তাপদাহে ভ্যান না চালিয়ে কাজ করছেন মাছের ঘেরে। মাছের ঘেরে হওয়া শ্যাওলা তুলে বিক্রি করে চালাচ্ছেন জীবন-জীবিকা। মহেশ্বরকাটি থেকে আশাশুনি যাওয়ার পথে দেখা হয় তাদের সঙ্গে। সেখানে দেখা যায় আনিসুর ডুব দিয়ে শ্যাওলা বাছাই করে নৌকায় রাখছেন আবার এবাদুল সেগুলো পানি দিয়ে টেনে রাস্তায় রাখছেন। আবার তাদের মধ্যে শহিদুল ও আমজেদ শ্যাওলা-ঝাড়াই বাছাই করে ভ্যানে তুলছেন।
পথে যেতে যেতে কথা হয় শহিদুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা এই সময়টা শ্যাওলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করি। আমরা বড় বড় মাছের ঘেরে গিয়ে শ্যাওলা বাছাই করি। তারপর সেগুলো ভ্যানে তুলে অন্য মাছের ঘেরের মালিকের কাছে আমরা বিক্রি করি। সেখান থেকে আমরা ভ্যান প্রতি শ্যাওলা ৫০০-৬০০ টাকা দরে বিক্রি করি। সেই বিক্রির টাকা দিয়ে চলে আমাদের সংসার চলে।’

ছবি: সারাবাংলা
পাশে থাকা আমজেদ, এবাদুল একই সুরেই বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে কাজ করি। প্রতিদিন একেকটা একটা মাছের ঘেরে গিয়ে আমরা শ্যাওলা বাছাই করি। তারপর সেগুলো ভ্যানে তুলে মিষ্টি জলের ঘের আছে সেদিকে গিয়ে আমরা বিক্রি করি। সেখান থেকে আমরা গাড়ি প্রতি ৫০০-৬০০ টাকা করে পায়। সেই টাকা দিয়ে আমাদের জীবিকা চলে। আমাদের পরিবারের ভরণপোষণ হয়।’
এমনই এক ভিন্নধর্মী পেশা বেছে নিয়েছেন আশাশুনি উপজেলার কুন্ডনদা এলাকার বেশ কিছু নারী। তারা সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শ্যাওলা কুড়িয়ে সংসার চালাচ্ছেন। ভোরে সূর্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে তারা নেমে পড়েন মাছের ঘেরে। শুরু করেন শ্যাওলা বাছাইয়ের কাজ। মাছের ঘেরের শ্যাওলা বাছাই করে চলে তাদেও সংসার। ৫ ঘণ্টা কাজের বিনিময়ে মজুরি পান ২২০ টাকা।
লক্ষ্মী, সেফালি, ফিরোজারা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা ৫ ঘণ্টা শ্যাওলা বাছাই করে ২২০ টাকা পায়। কিন্তু একই সময়ে পুরুষরা বাছাই করলে তারা মজুরি পান ৩৫০ টাকা। একই কাজ একই শ্রম কিন্তু আমাদের বেলায় মজুরি কম। আমরা যে কাজ করি তারা ও একই কাজ করে। আমরা পেটের দায়ে কম টাকায় শ্যাওলা বাছাই করা কাজ করি। এই গুলো বাছাই করে যে টাকা পায় তাই দিয়ে আমরা সংসার চালাই।’
শ্যাওলা যে কাজে ব্যবহৃত হয়-
এই শ্যাওলা কি কাজে ব্যবহার হয় এমন প্রশ্নের উত্তরে আশাশুনির গোয়ালডাঙ্গা গ্রামের মৎস্যচাষী আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমার ১০ বিঘার ঘেরে আমি প্রতি বছর সাদা মাছের চাষ করি। ফলে তাদের খাদ্যের জন্য আমরা শ্যাওলা ক্রয় করে ঘেরে ফেলি। সাদা মাছের জন্য এই শ্যাওলা উপকারি। আর মাছে এই শ্যাওলা খায় খুব। খেলে মাছ ও মোটা তাজা হয়। ফলে তার জন্য আমরা খেতে দেয়।’

ছবি: সারাবাংলা
শ্যাওলা ঘের থেকে পরিষ্কার করে দিচ্ছেন আবার কেউ এটা মাছের খাবার হিসাবে ব্যবহার করছে এমন প্রশ্নের উত্তরে আশাশুনির কুন্ডনদা এলাকার মাছচাষী সাগর বলেন, ‘আমার ২০ বিঘা জমিতে আমি বাগদা মাছের চাষ করি। ফলে ঘেরে প্রচুর শ্যাওলা জন্মায়। এই শ্যাওলা বাছাই না করলে বাগদার পোনা চলাচল করতে পারে না। ফলে আমাদের এই শ্যাওলা বাছাই করে ফেলতে হয়। বাছাই করার পর যখন এই শ্যাওলা গোড়া পচেঁ যায় তখন সেটা মাছে খায়। তখন বাগদা মাছের জন্য উপকারী।’
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি. এম. সেলিম মুঠোফোনে বলেন, ‘শ্যাওলা চিংড়ি ঘেরের জন্য ক্ষতিকর। কারণ একটা ঘের কমপক্ষে যদি ৫-৭ ফুট গভীর হওয়া প্রয়োজন। না হলে এর থেকে কম গভীর হলে শ্যাওলা জন্মে মাছের ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা থাকে। তখন এই শ্যাওলা জন্মে মাছের গতিপথ রোধ করে ক্ষতি করে। কারণ ঘেরের গভীরতা না হলে সূর্যের আলো এই শ্যাওলার জন্য প্রবেশ করতে পারে না। ফলে মাছের জন্য ক্ষতি হয়। কারণ সূর্যের আলো না পড়লে ঘেরে খাদ্য উৎপাদন হবে না। ফলে তখন মাছের জন্য ক্ষতিকর।’
অন্যান্য ঘের মালিক তো এই শ্যাওলা মাছের খাবার হিসাবে ব্যবহার করছে এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘কিছু কিছু সাদা মাছ আছে যাদের রাক্ষুসে মাছ বলা হয়। সেসব ঘেরে মাছের জন্য শ্যাওলা খেতে দেয় ঘের মালিকরা। স্বল্প সময়ে খেতে দিয়ে মাছ বড় করে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য। সাতক্ষীরায় জেলায় সর্বমোট ৭০ হাজারের মতো চিংড়ি ঘের রয়েছে।’